সর্বশেষ

6/recent/ticker-posts

Header Ads Widget

সমাজ ও জাতির উপর শিক্ষার প্রভাব..

 

                                                       প্রফেসর ডা: এমএ ওয়াহাব ।

সমাজ ও জাতির উপর শিক্ষার প্রভাব..

বর্তমানে এসএসসি, দাখিল, আলিম ও এইচএসসি পরীক্ষার যে ফল প্রকাশ করা হয় তাতে দেখা যায় যে গড়পড়তা দুই তৃতীয়াংশ পরীক্ষার্থী পাশ করে । বাকীরা পাশ করে না। পরীক্ষার এই ফল হতে  একটি কথা বুঝে নিতে হবে এবং স্বীকার করতে হবে যে জাতি শিক্ষার ক্ষেত্রে ঐ  বৎসরটি এক তৃতীয়াংশ ঐ একই স্থানে রয়ে গেল। এইসব  ছেলেমেয়েদের দৈহিক এবং চাহিদা বৃদ্ধি বাধাগ্রস্থ হয় না। তাদের মন মানসিকতা, কার্যকলাপ, সমাজ ও জাতির উপর তার প্রভাব ইত্যাদি লক্ষ্য করার বিষয়। সেই সকল আলোচনার আগে যারা কৃতকার্য হলো তাদের দিকটায় নজর দেওয়া যাক। যারা পাশ করে তারা অনেক পড়ে পাশ করে। বেশী নম্বর পাবার জন্য তারা সর্বক্ষণ লেখাপড়া নিয়ে ব্যস্ত থাকে। পরীক্ষায় যাতে তারা বেশী নম্বর পায় সেই জন্য অবিভাবকরাও তাদের সন্তানদের প্রতি যত্নবান থাকেন। স্কুল কলেজের সময়ের আগে ও পরে প্রাইভেট টিউটরদের নিকট সময় দিতে হয়। স্কুল সময়ে স্কুলে ব্যস্ত থাকতে হয়।

 

ছুটির দিনে হয় প্রাইভেট টিউটরের নিকট যেতে হয় অথবা বাড়ীর কাজ যা দেয়া হয় তা করে স্কুলে বা প্রাইভেট টিউটরের কাছে জমা দিতে হয়। খেলাধুলা, সাংস্কুতিক চর্চা, ভ্রমন, আত্মীয়স্বজনের সাথে দেখা করা , কিছু কিছু সামাজিক বা  ধর্মীয় কাজে অংশ গ্রহণ করা এবং ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণ করা ইত্যাদির জন্য তার কোন সময় নেই। সুতরাং ঐ সবকিছু যা মানুষের জীবনে মহৎ গুণাবলীর বিকাশ ঘটায় তা হয়ে উঠে না। পরীক্ষায় পাশ করে চাকুরী, ব্যবসা এবং অন্যান্য  বিভিন্ন পেশায় যারা নিয়োজিত হচ্ছে অধিকাংশ  ক্ষেত্রে দেখা যায় যে ঐসব গুণাবলীর বিকাশের অভাবে তাদের মধ্যে ধৈর্য্য, সহনশীলতা, ক্ষমা করার ক্ষমতা, নিয়মানুবর্তীতা ও অন্যের দু:খ বেদনাকে অনুধাবন করার ক্ষমতা জন্ম গ্রহণ করে নাই। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা নিজেদের পঠিত বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করে ও নিজেরা আর্থিকভাবে সফলও হয় বটে কিন্তু পরিবার,  সমাজ ও জাতি তাদের নিকট যে উপকার আশা করে তা পায় না।

 

আর একটি বিষয় লক্ষ্য করার মতো তা’ হলো এই যে অনেক মেধাবী ও সচ্ছল পরিবারের ছেলে মেয়েরা এইচ,এস,সি পাশ করার পরে, আবার অনেকে এস,এস,সি পাশ করার পূর্বেই লেখাপড়া করার জন্য অন্য দেশে চলে যায়। গত দশ বছর প্রত্যেক বোর্ডের অনেক মেধাবী ছাত্রই দেশে নেই অথবা খুব ক্ষুদ্র অংশই আছে। তারাও অনেকে গ্রাজুয়েশনের পরে বিদেশে পাড়ি দিতে চেষ্টা করে। তাদের নিকট হতে দেশ ও জাতি যা পাচ্ছে তা নৈরাশ্যজনক। তাদেরকে যদি দেশে সুশিক্ষিত করে দেশের মাটিতে মেধার বিকাশ ঘটান যেত তবে দেশের সত্যিকারের উপকার হত। দুর্ভাগ্যবশত বাস্তবে তা খুবই কম হচ্ছে। প্রথমত তাদের অনেকেই দেশে ফিরে আসছে না। যারা আসছে তারা অধিকাংশই গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হচ্ছে। কিন্তু দেশ ও জাতির ক্রান্তিলগ্নে এবং সত্যিকারের প্রয়োজনের সময় তারা কতটুকু সঠিক ও সাহসী প্রদক্ষেপ নিতে পারছে তা ভাববার বিষয়। লক্ষনীয় যে, যে ব্যক্তি ভিন্ন দেশে লেখাপড়া করে এবং বহুদিন বসবাস করে সেই দেশের অনেক কিছুই স্বাভাবিকভাবে মনের অজান্তেই গ্রহন করে এবং সেই দেশের প্রতি একটি টান  বা দরদ গড়ে উঠে। যত কম বয়সে  যায় এবং যত বেশীদিন থাকে  দরদটা  ততই বেশী হয়।   এটা স্বাভাবিক এবং মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। এই দুর্বলতা সারাজীবনই থাকে।

তাই প্রয়োজনের সময় নিজের, সমাজের ও জাতির  স্বার্থ রক্ষার জন্য এমন একটা দেশের সঙ্গে নেগোশিয়েশন বা দর কষাকষির প্রয়োজন হলে কতটা দৃঢ়তার সঙ্গে এইসব ব্যক্তির পক্ষে করা সম্ভব তা  প্রয়োজনের সময়ই মাত্র প্রতীয়মান হয়। অনেক  ক্ষেত্রেই দেখা যায় উচ্চ পর্যায়ে অবস্থানরত এইসব ব্যক্তি সর্বক্ষেত্রে তার শিক্ষাজীবনের অবস্থানের কারণে, নিজ দেশ  ও জাতির স্বার্থের কথা ভেবেও দৃঢ়ভাবে তা রক্ষা করতে অসুবিধা ও বিড়ম্বনার সম্মুখীন হচ্ছেন। সেইজন্য দেশেই এইসব ছেলেমেয়েদের সর্বোৎকৃষ্ট শিক্ষার ব্যবস্থা করা  এবং শিক্ষাজীবন শেষ হওয়ার পরে দেশে থাকার অনুকুল পরিবেশ ও সুযোগ সৃষ্টি করার কোন বিকল্প নেই।

যারা অকৃতকার্য হচ্ছে, সেই অর্ধশিক্ষিত ও অদক্ষ বিশাল যুব জনগোষ্ঠী তাদের নিজেদের, সমাজের ও জাতির জন্য যে কতটা সমস্যার সৃষ্টি করছে তা ইতিমধ্যেই প্রতীয়মান হতে শুরু করছে। পেশাজীবি বা কারিগরী কোন শিক্ষায় তারা শিক্ষিত বা জ্ঞানী নয়।  জীবিকার প্রয়োজনে তারা কোন অর্থবহ কাজে নিয়োজিত না হতে পেরে দিশেহারা ও নিরাশ হয়ে পড়ছে। প্রয়োজনের তাগিদে তারা অনেকেই মন্দকাজে লিপ্ত হচ্ছে।পুরুষ ও মহিলা উভয়েই কু-পথে গমন করে নিজেদেরকে  ধ্বংস এবং সমাজকে অশান্ত , কুলষিত ও নৈরাজ্যময় করে দেশটাকে বসবাসের অযোগ্য করে তুলছে। এ যে কতটা হয়েছে এবং কি পর্যায়ে গেছে তা কেউকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে হবে না। কিন্তু এসব বালক বালিকারা খারাপ হয়েতো জন্ম গ্রহন করে নাই। যখন তারা স্কুল জীবনে ছিল এবং তাদের পিতামাতা যখন তাদেরকে স্কুলে পাঠিয়েছিলেন তখন তারা’ত এই পরিনতি আশা করেন নাই। তবে কেন এমনটি হলো ? কি করেই বা এটা হতে মুক্তি পাওয়া যাবে। এইসব ভেবে দেখা এবং সংশোধনীমূলক পদক্ষেপ এখনই গ্রহণ করা প্রয়োজন। স্কুল কলেজগুলিতে কি পরিবেশ বিরাজ করছে তা একটু দৃষ্টি দিলেই দেখা যাবে। কারা শিক্ষক হচ্ছেন এবং তারা কি পরিবেশে শিক্ষাদান করছেন।  সকলে না হলেও কিছু শিক্ষক অন্য ভাল চাকুরী না পেয়ে শিক্ষক হচ্ছেন। কিন্তু শিক্ষক হওয়ার পরে তাকে স্থায়ী পেশা হিসাবে না নিয়ে অন্যত্র যাবার চেষ্টা অব্যাহত রাখছেন। আবার অনেকেই চাকুরী শুরুর পরে এই পেশাকে ভালবেসে এই পেশাতেই রয়ে যাচ্ছেন।

তারা সুযোগ সুবিধা ও বেতন  অপ্রতুল মনে করে অর্থের জন্য চাকুরীর বাইরে কাজও করছেন ।

তারা কি এবং কতটুকু শিক্ষা দিচ্ছেন, তা’ কতটা কার্যকরি হচ্ছে তার যথাযথ মূল্যায়ন একটা পযবপশ ষরংঃ  এর নিরিখে করা হচ্ছে না । সময়মত স্কুলে আসা এবং যাওয়ার রেকর্ড ঠিকমত রাখা হচ্ছে না। আর একটি বড় সমস্যা হচ্ছে এই যে প্রতিটি শ্রেণীতে ছাত্র সংখ্যা এত বেশী যে শিক্ষকের পক্ষে প্রতিটি ছাত্রের দিকে নজর দেওয়াও সম্ভব হচ্ছে না। পাঠ্যপুস্তকের সারবস্তু বুঝতে না পেরে ছাত্রদের শিক্ষার প্রতি আগ্রহ হ্রাস পাচ্ছে । ফলে ক্লাসে ছাত্রদের উপস্থিতিও হ্রাস পাচ্ছে। সেইসাথে যোগ হচ্ছে স্কুলের বাইরেও শিক্ষার পরিপন্থী নানা বিষয়ের আকর্ষণ।

কয়েক বৎসর পূর্বে একটি দৈনিক পত্রিকায় “আমরা সুশিক্ষা এবং সুশিক্ষার কদর বিহীন জাতি হইতে পারি না” শীর্ষক একটি প্রবন্ধ পড়েছিলাম। এটা পড়ে অনেকেই উদ্বিগ্ন  হয়েছিলেন। কিন্তু কেউ কিছুই করতে পারেন নাই। যারা কিছু করতে পারতেন তারা হয় প্রবন্ধটি পড়েন নাই অথবা পড়লেও বিশেষ তোয়াক্কা করেন নাই, করলে কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করা যেত।

শিক্ষা জাতির মেরুদন্ড এটা স্বতসিদ্ধ কথা। আর তাই যদি হয়ে থাকে তবে বাঙ্গালী জাতির মেরুদন্ড ভেঙ্গে না পড়লেও তাতে যে ঘুন ধরেছে তাতে সন্দেহ প্রকাশ করার কোন কারণ নেই। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, যে বা যারা এদেশের শিক্ষা ও শিক্ষা ব্যবস্থাপনাকে দুর্বল করে জাতিকে অশিক্ষিত ও জ্ঞানবিহীন দেখতে চায় ও জাতিকে শিষ্টাচার ও নৈতিকতা বর্জিত জন সমাজে পরিনত করতে চায়, মাদকাসক্ত করে বিচার বুদ্ধিহীন, জ্ঞান বিহীন, নেতৃত্ববিহীন সমাজে পরিনত করতে চায়,  তারা যে তাদের লক্ষ্য অর্জনে অনেকটা সফলতা লাভ করেছেন তা সকল সচেতন নাগরিকই জানেন।

এ পরিস্থিতি হতে মুক্তি লাভ করতে হলে সমাজের সচ্ছল ও নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি, উচ্চ পর্যায়ের সরকারী কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক নেতাদেরকেই সঠিক ও সাহসী পদক্ষেপ নিতে হবে। সরকারের ও জনগণের দেওয়া দায়িত্ব এবং ক্ষমতা, যা পবিত্র আমানত, সেই আমানতের সঠিক জিম্বাদারী হয়ে সঠিক ব্যবহার করলে দেশ ও জাতি আরও শিক্ষিত, সমৃদ্ধ ও সম্মানজনক পর্যায়ে অবস্থান করতে পারবে।



 

 

Post a Comment

0 Comments