লেখক - অধ্যাপক ডাঃ এম এ ওয়াহাব ।
সাবেক চেয়ারম্যান, ইউরোলজী বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় ।
কয়েক বছর আগে পরিচিত যে লোকের নাম আপনি সহজে মনে করতে পারতেন এখন কি তা পারেন ? আপনি কি এক পায়ের উপর দাঁড়িয়ে মোজা পরতে পারেন ? আপনার চুল এবং নখ আগে যতদিন পর পর কাটতেন এখনও কি ততদিন পর পর কাটতে হয় ? আগে আপনি প্রস্রাব না করে যতক্ষণ ধরে রাখতে পারতেন এখনও কি তা পারেন ? আপনার যৌন উত্তেজনা কি এখনও আগের মত আছে ? আপনি কি অতীতের থেকে ভবিষ্যতের কথা বেশী বলেন ? উপরোক্ত প্রশ্নগুলোর বেশীর ভাগ সংখ্যকের উত্তর যদি না হয় তবেই বুঝবেন যে আপনি বুড়িয়ে যাচ্ছেন । বুড়িয়ে যাওয়ার এইসব হলো আলামত। এসব অবশ্য বুড়িয়ে যাবার কারন নয় ।
আমরা জন্মগ্রহণ করি, বড় হই, ক্ষয়ে যাই তারপর একদিন মৃত্যুবরন করি । একথা আমাদের জানা আছে । পছন্দ করি আর না করি এ আমাদের গ্রহণ করতেই হয়, এর কোন বিকল্প নেই । বুড়িয়ে যাবার প্রক্রিয়াটি কখন, কিভাবে এবং কেমন করে শুরু হয় সে সম্পর্কে আমাদের স্বচ্ছ কোন ধারণা নেই । কোনটাই বা আগে শুরু হয় এবং এটাকে ঠেকাবার বা অন্তত দেরী করে যাতে শুরু হয় তার কোন ব্যবস্থা আছে কিনা ? জানলে কিছু একটা করা যেত। অনেককেই বলতে শুনেছি সত্তর বছরের যুবক লোক আছে আবার অনেকে বলেন পঞ্চাশ বছরের বৃদ্ধ। কি সব লক্ষণ দেখে তারা এ কথা বলেন ? দৈহিক শক্তি যখন কমে আসে, কোন কিছু সৃষ্টির আর যখন ইচ্ছা থাকে না, পারিবারিক দায়িত্ব যখন আর না থাকে, খাদ্যের প্রতি আগ্রহ কমে যায় এবং নিজের মধ্যে প্রাণশক্তির অভাব বোধ হয়, তখন বুড়ো হয়ে যাচ্ছি বলে সন্দেহ হতে থাকে। এরই সাথে শারীরিক কিছু পরিবর্তনও লক্ষ্য করা যায়। চুল সাদা এবং পাতলা হয়ে যায়, দাঁত পড়ে যেতে আরম্ভ করে, চোখের জ্যোতি ও শ্রবণশক্তি কমে যায়, মুখের চামড়া ঢিলা হয়ে যায় এবং তাতে ভাজ পড়তে শুরু করে । তখনই অধিকাংশ মানুষ নিজেকে বৃদ্ধ বলে ভাবতে শুরু করে ।
জৈবিক, শারীরিক এবং মানসিক বৃদ্ধি যেমন একসাথে হয় না তেমনি তাদের বৃদ্ধির গতিও সমান নয় । এদের শুরু এবং বৃদ্ধির গতি একে অন্যকে প্রভাবিত করতে পারে এবং একটা অন্যটার উপর কিছুটা নির্ভরশীলও বটে । একটা যেমন আর একটাকে অতিক্রম করতে পারে তেমনি একটা অন্যটার আগে বা পরেও শুরু হতে পারে । বৈজ্ঞানিক, বিশেষ করে চিকিৎসা শাস্ত্রে এ সবের আলোচনা ও ব্যাখ্যা দেবার আগে দুই একটি বাস্তব উদাহরণ দিলে পরবর্তী আলোচনা অনুধাবন করতে সহজ হবে এবং পাঠকের কিছু ব্যক্তিগত উপকার হবে বলে আশা করা যায় ।
কয়েক বছর আগে সুইডেনের কৃষি বিজ্ঞানের একজন অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপকের সাথে আমি পাশাপাশি বসে ঢাকা থেকে সিডনীতে যাচ্ছিলাম । গম উৎপাদনের গবেষণার প্রতি তার বিশেষ আকর্ষণ ও পারদর্শিতা ছিল । ইদানিং জাতি সংঘের একটা নুতন প্রকল্প নিয়ে বিশেষ ব্যস্ত থাকেন বলে জানালেন । তার জন্য তাকে দেশে দেশে যেতে হয় এবং গম চাষের উপর কর্মশালা করতে হয় ও বক্তৃতা দিতে হয় । সর্বপরি সুন্দর প্রাণশক্তিতে ভরপুর সুস্বাস্থ্যের অধিকারী কর্মক্ষম যুবক লোকের মতই মনে হয় । প্লেন আকাশে উড়ার পর সিট বেল্ট বাধার সংকেত অফ হবার পরেই তিনি তার পায়ের জুতা খুলে ব্যাগ থেকে একজোড়া শ্লিপার বের করে পরলেন । তারপর ব্যাগ থেকে কাগজ কলম বের করে কাজ করা শুরু করলেন । ঘুম এবং ডিনার খাবার সময় ছাড়া আর বাকী সময় লেখাপড়া করেই কাটালেন । তার চেহারাটি লক্ষ্য করার মত, প্রায় সত্তর বছর বয়স, ছিপছিপে গড়ন, বুদ্ধিদীপ্ত চেহারা, সাদা চুল, ক্লিন শেভ, তীক্ষ নাক ও চোখ, সর্বপরি চিন্তাশীলতা, আভিজাত্য এবং অমায়িকতার একটা বহিঃপ্রকাশ লক্ষ করা যায় । তার খাবারের সিলেকশান লক্ষনীয়, ড্রিংকের জন্য এক গ্লাস টমাটো জুস নিলেন । লবন এবং মিষ্টি খাবার ট্রেতে থাকলেও তিনি সেটা খেলেন না । মাছ এবং সবজির মেনডিস নিলেন এবং তারসাথে এক গ্লাস হোয়াইট ওয়াইন পান করলেন । সব শেষে চিনি ছাড়া এক কাপ ব্লাক কফি ।
একবার তিনজন রুগীর প্রায় একই সময়ে একই অসুখের জন্য একই ধরনের অপারেশন করা হলো । তাদের দৈহিক ও মানষিক পার্থক্য উলেখযোগ্য । অপারেশনের পরে তাদের সুস্থ হয়ে সেরে উঠার প্রভেদটাও ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন ।
তিনজন রুগীর বয়সই ৭০ থেকে ৯০ বছরের মধ্যে ছিল । তিনজনের মধ্যে বয়স যার বেশী ছিল তিনি গ্রামে বাস করেন । জমিজমা, পরিবার পরিজন সমাজ সংসার নিয়ে তার বাস । ধর্মপরায়ণ, সুখী, মধ্যবিত্ত পরিবার। জমিজমা দেখাশুনা করা এবং সমাজ সেবাতেই ব্যস্ত থাকেন । নিজ এলাকায় এসব কাজ আরও করার তার ইচ্ছা প্রকট । অপারেশনের পর কোন জটিলতা ছাড়াই ভাল হয়ে দেশে চলে গেলেন। বস্তুতঃ প্রোষ্টেট গ্লান্ড বড় হওয়া ছাড়া তার আর কোন অসুখ ছিল না ।
বাকী দুইজনের একজন ছিলেন ব্যবসায়ী। প্রোষ্টেটের অসুখ ছাড়াও তার গ্লান্ড প্রেসার এবং ডায়াবেটিস ছিল । হাসপাতালেও তিনি বিভিন্ন কারনে সবসময়ে উদ্বিগ্ন এবং চিন্তাযুক্ত থাকতেন। চোখের নীচে কালো দাগ, ভাজপড়া মুখের চামড়া, বাধানো দাঁত, পাতলা চুলে কালো রং করা । হাসপাতালে আসার পরে কয়েকদিন সেটা সম্ভব হয় নাই বলে চুলের গোড়ার দিকটা সাদা দেখাচ্ছিল । সর্বপরি বয়সের চেয়ে তাকে আরও বেশি বৃদ্ধ বলে মনে হয় ।
এদের মধ্যে সবচেয়ে কম বয়সী যিনি, তিনি ছিলেন শারীরিক এবং মানসিক দিক দিয়ে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় । তিনি উত্তরাধিকারসূত্রেই ধনী ছিলেন । ঢাকা শহরে তার অনেক টাকা আছে এবং বাড়ী ভাড়া পেতেন । শহরে তার মহল্লায় সবাই তাকে ধর্মপরায়ন বলে জানত । ঈদে গরীবদের মধ্যে অনেক শাড়ী, লুঙ্গী দান করেন । কোরবানীতে অনেক দামী গরু কোরবানী দেন । নিজেকে বিশেষ কোন কাজ করতে হয় না । শারীরিক পরিশ্রম একেবারেই করেন না । মোটা, মেদ বহুল নিষ্ক্রিয় শরীর । একবার হার্ট এ্যাটাক হয়ে গেছে, ষ্টেনটিং করা হয়েছে এর সাথে আছে ডায়াবেটিস, ব্ল্যাড প্রেসার এবং বাতের ব্যাথা । শত সাবধানতার মধ্যেও অপারেশনের পর সব রকম জটিলতা যেন তাকে পেয়ে বসল । শুভানুধ্যায়ী এবং আত্মীয়-স্বজনের ভীড়ে চিকিৎসা দিতেও অনেক সময় অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয়েছে । আর্থিক দিক দিয়ে ধনী থাকলেও শারীরিক কষ্টের তার সীমা ছিল না । অনেক ভোগান্তির পর হাসপাতাল ত্যাগ করে গেলেন । বয়সের তুলনায় অনেক বেশী বৃদ্ধ এবং শারীরিক অসুস্থতায় প্রায় পঙ্গু ।
চল্লিশ বছরের একজন গ্রাম্য ধান ব্যাবসায়ী একবার আমার বাড়ীতে ধান কিনতে এসেছিল। তার উস্ক শুষ্ক চুল, মুখের ভিতর একটিও দাঁত নেই । কিন্তু আশা ও উদ্দীপনায় ভরপুর লোকটি । মানসিকভাবে যুবক হলেও দেহে বয়সের তুলনায় অনেক বৃদ্ধ ।
মানুষের শরীর আত্মার ধারক। শরীর অকেজো হয়ে গেলে আত্মা শরীর ছেড়ে চলে যায় । তাই আত্মা থাকাকালীনই শরীরের প্রয়োজন হয় । শুধু প্রয়োজনেই নয় আত্মা যা কিছু করতে চায় সেইসব কাজ করার জন্য শরীরকে সুস্থ থাকা লাগে । তাই শরীর অসুখে বা আঘাতে ধ্বংস হয়ে গেলে আত্মা আর সেই শরীরে থাকতে এবং কাজ করতে পারে না । শরীরের নিজস্ব গঠন এবং ক্রিয়া আছে। সেসব ক্রিয়া কর্ম আত্মার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ও প্রভাবিত হয়ে থাকে। শরীরের এক একটা সিস্টেম ভিন্ন ভিন্ন কাজের জন্য গঠিত হয় ।
এন্ডোক্রাইন এবং নার্ভাস সিস্টেম ((Endocrime and Nervous System) শারীরিক বর্ধন, রক্ষণাবেক্ষন ও ক্ষয়িষ্ণু প্রক্রিয়াকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে। অন্ডোকোষ, পেট এবং মস্তিষ্কের মধ্যের গ্রন্থি (গ্ল্যান্ড) গুলি শারীরিক বৃদ্ধি ঘটিয়ে থাকে । এসব গ্রন্থি বিভিন্ন প্রকারের জারক, যাকে হরমোন বলা হয় সে সব তৈরী করে ।
গ্রোথ হরমোন এবং সেক্স হরমোন এ ব্যাপারে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। গ্রোথ হরমোন জীবনের প্রারম্ভে মুখ্য ভূমিকা পালন করে । সব অঙ্গ প্রত্যঙ্গই এর প্রভাবে বড় হয়। ১৭-১৮ বয়স অবধি এই প্রক্রিয়া চলে । তারপরও এটা একেবারে থেমে যায় না । সারা জীবনই ধীর গতিতে চলতে থাকে। শরীরের রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের জন্য এর প্রয়োজন হয় । শারীরিক কোষগুলি মরে যায় আবার নুতন কোষ জন্ম গ্রহণ করে যদিও সংখ্যায় এরা ধীরে ধীরে কমতে থাকে ।
কৈশোরে ছেলেদের অন্ডকোষ থেকে টেসটোসটেরোন হরমোন বেশীমাত্রায় তৈরী হয় । এর প্রভাবে শিশু এবং ছোট বালকের দেহের চর্বি কমতে থাকে । তার স্থলে ঘাড় ও মাংস বৃদ্ধি পায়, গলার নরম হাড় উঁচু হয় এবং গলার স্বরের পরিবর্তন হয় । মুখে, বগলে ও যৌনাঙ্গের চারিদিকে চুল গজায় । অন্ডকোষ বড় হয়, পুরুষাঙ্গ লম্বা ও বড় হয় । শারীরিক উচ্চতা বাড়ে, কয়েক বছরের মধ্যেই ছেলেটি যুবক হয়ে যায় । সাহস, আত্মবিশ্বাস ও বিচারবুদ্ধির পরিবর্তন হয় । মেয়েদের প্রতি অনুসন্ধিৎসু হয়ে উঠে ।
একই প্রক্রিয়া মেয়েদের মধ্যেও শুরু হয় । ডিম্বকোষ (Ovary) বড় হয় এবং ইস্ট্রোজেন ও প্রজেষ্ট্রেরন নামক হরমোন তৈরী করে । দৈহিক চর্বির পুনঃবিন্যাস হয়ে দেহের পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায় । স্তন বড় হয়, যৌনাঙ্গের চারিদিকে চুল গজায় । মাসিক শুরু হয় এবং পুরুষদের প্রতি অনুসন্ধিৎসু হয়ে উঠে । বালিকাটি শারীরিক এবং মানসিক দিক দিয়ে যুবতী হয়ে উঠে ।
যৌবনকালের স্থায়িত্ব সবার জন্য এক নয় । জীবনের এই সময়টাই সবচেয়ে শৃজনশীল । যৌবনের স্থায়িত্ব অনেক কিছুর উপরে নির্ভরশীল । এ সময়ে শারিরীক মানসিক এবং সৃষ্টি ক্ষমতা উচ্চমার্গে থাকে। সবকিছুতেই বংশের প্রভাব (হেরিডিটি), শারীরিক গঠন এবং জেনেটিক ফ্যাক্টর মূখ্য ভূমিকা পালন করে । এসব সাধারণত নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাবিত করা যায় না । কিন্তু যৌবনের স্থায়িত্বকে অনেক ফ্যাক্টর দিয়ে প্রভাবিত করা যায় । অন্ততঃ ক্ষয়িষ্ণু প্রক্রিয়া শুরু হওয়াটা কিছুটা হলেও দূরে সরিয়ে রাখা যায়। সুশৃঙ্খল জীবন, সুষম আহার, কায়িক পরিশ্রম, মানষিক অবস্থা, পরিবেশ, কাজের প্রকৃতিও তাতে সন্তুষ্টি, আত্মতৃপ্তি, বন্ধু এবং পারিবারিক সদস্যদের সাথে সম্পর্ক, ধর্মীয় বিশ্বাস ও তার অনুশীলন এসবই যৌবনের দৈহিক ও মানসিক স্বাস্থ্য এবং এর স্থায়িত্বের উপর গভীর প্রভাব বিস্তার করে ।
বার্ধক্যের প্রক্রিয়া শুরু হলে কিছু দৈহিক পরিবর্তন ঘটে। কিছু আলামত সহজেই চোখে পড়ে । আস্ওয়ালা কিছু টিসু, যাদের কোলাজেন বলে, চামড়ার নিচের এই টিশু ধীরে ধীরে ঢিলা হতে থাকে । চামড়া পাতলা এবং ঢিলে ঢালা হয়ে যায় । সহজেই ধরা যায় এবং এর নীচের মাংস বা হাড়ের উপর সহজেই নাড়ান যায় । হাত পায়ের রক্তের শিরাগুলি ভেসে উঠে। মুখের চামড়ায় ভাজ পড়ে যায় এবং ক্ষয় হয়ে যায়। কোলাজেন টিসুগুলির স্থানে চর্বি জমে যায় । মুখের সৌন্দর্য পুনরুদ্ধারের জন্য অনেকে লিপোস্যাকশান পদ্ধতিতে অপারেশন করে থাকেন । চুল এবং নখ বড় হবার গতি কমে যায়। নখ পাতলা এবং ভঙ্গুর হয়ে যায় । চুল তার জৌলস হারিয়ে সাদা ও পাতলা হয়ে যায় । দাঁতগুলি প্রথমে নড়তে ও ধীরে ধীরে একটা একটা করে পড়তে শুরু করে। শরীরের মধ্যপ্রদেশে চর্বি জমতে থাকে । চোখের মাংসপেশী দুর্বল হওয়ার জন্য চশমা ব্যাবহার করতে হয় । চোখের লেন্স অস্বচ্ছ হয়ে গিয়ে ছানি পড়ে এবং দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাবার জন্য অপারেশনের প্রয়োজন হয়ে পড়ে । হাড় থেকে ক্যালসিয়াম কমতে থাকে । এর ফলে হাড় দুর্বল হয়ে যায় । বিশেষ করে কোমর, হিপ জয়েন্ট এবং হাতের হাড়ে পরিবর্তন বেশী হয় এবং সামান্য আঘাতেই তা ভেঙ্গে যায় । মেরুদন্ডের হাড় ক্ষয়ে যায় এবং রগ দুর্বল হবার ফলে শরীরের উচ্চতা কমে যায় এবং মানুষ কুঁজো হয়ে যায় । মাংসপেশীগুলো শুধু যে দুর্বল হয়ে যায় তাই নয় ক্ষয় হয়ে পরিমানেও কমে যায় । শরীরের ওজন স্বাভাবিকভাবেই কমে যায় । অনেক ক্ষেত্রে আবার অতিরিক্ত চর্বি জমে ওজন বাড়তে পারে । পুরুষ এবং মহিলা উভয়ের মধ্যেই উপরোক্ত পরিবর্তনগুলি ঘটতে থাকে ।
পুরুষ মানুষের অন্ডকোষ ছোট হয়ে যায় এবং তার নিগৃত হরমোন টেসটোসটেরোন এর পরিমান কমে যায় । চেনা জিনিষ অনেক সময়ে রিকোগনাইজ করতে সময় লাগে । জানা জিনিষ মনে করতে সময় লাগে । কাজের উৎসাহ উদ্দীপনা কমে যায় । পুরুষাঙ্গ সহজে শক্ত হতে চায় না এবং দ্রুত বীর্যপাত হয়ে যায় । পুরুষের এই অবস্থাকে মেয়েদের মেনোপজ বা মাসিক বন্ধ হয়ে যাবার সাথে তুলনা করা হয়েছে । ডাক্তারী ভাষায় একে এন্ড্রোপজ বলে । প্রষ্ট্রেট গ্ল্যন্ড বড় হয়ে প্রসাব ঘন ঘন হয়, বের হতে বাধাগ্রস্ত হয়, প্রস্রাব ধরে রাখতে কষ্ট হয় । ঘূমের পরিমান ও গভীরতা কমে যায় ।
মহিলাদের ইস্ট্রোজন ও প্রজেসটেরন হরমোন-এর পরিমাণ কমে যায়, ওভারী বা ডিম্বকোষ থেকে এই হরমোন তৈরী হয় । পরিমাণে কমে যাবার ফলে ঋতুগ্রাব কমে যেতে যেতে এক সময়ে বন্ধ হয়ে যায় । এই অবস্থাকে মেনোপজ বলে । বুক ধড়পড়, শরীর হঠাৎ গরম হয়ে যাওয়া মেজাজ খিট খিটে ইত্যাদি এই সময়ে দেখা যায় । স্তনের আশ ও গ্ল্যন্ড কমে যায় এবং চর্বি বেশী জমে যায়। যৌন এলাকার এসিডিটি (acidity) কমে যৌন এলাকা শুষ্ক হয়ে যাবার ফলে ইনফেশন হবার সম্ভাবনা বেড়ে যায় । যৌনাঙ্গের রস নিঃসরণ কমার ফলে এবং কম পিচ্ছিল হবার কারনে সহবাস কম আনন্দদায়ক ও কখনও কখনও ব্যাথা অনুভূত হতে পারে । এ প্রক্রিয়াকে বিলম্বিত করার জন্য এবং হাড় ভাঙ্গার সম্ভাবনা কমাবার জন্যে হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপী (HRT) দেয়া হয় । গ্রোথ হরমোন, সেক্স হরমোন, ভিটামিন এবং খনিজ পদার্থের অভাবের জন্য এসব পরিবর্তন হয় । অনেকে মনে করতে পারেন যে এইসব দিয়ে চিকিৎসা করলে বোধ করি বার্ধক্যের প্রক্রিয়া শুরু হবে না এবং মানুষ বুড়ো হবে না । বাস্তবে তা ঘটে না । কারন বয়সের ভারে অঙ্গ প্রত্যঙ্গগুলির এসব ব্যবহারের ক্ষমতা কমে যায় । সুতরাং বুড়ো হবার প্রক্রিয়াকে কিছুটা দেরী করান গেলেও ঠেকিয়ে রাখা যায় না । এক সময়ে তাই আল্লাহ সোবহানাতালার দ্বারা পূর্ব নির্ধারিত সময়ে মৃত্যু আসবেই । কিছু বিষয়ের উপর লক্ষ্য রাখলে এবং তা মেনে চললে দৈহিক, মানসিক, যৌন ও স্পিরিচুয়েল স্বাস্থ্যকে দীর্ঘায়িত করা যায় এবং তার ফলে মৃত্যুর কাছাকাছি সময় পর্যন্ত জীবনকে ফলপ্রসু, উপভোগ্য এবং স্বাবলম্বী রাখা যায় ।
উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হার্টের অসুখ, শ্বাসকষ্ট বাত ব্যথা ইত্যাদি অসুস্থতার সাধারণ কারণ। পঙ্গুত্ব এবং মৃত্যু এইসব অসুখ বা তার জটিলতার জন্যই বেশী হয় । সাধারণভাবে এসবের চিকিৎসা এবং নিয়ন্ত্রণ করা যায় এবং অনেক দিন অবধি স্বাস্থ্য ও যৌবন ধরে রাখা যায় ।
দুশ্চিন্তা বা টেনশনমুক্ত জীবন কোন সময় ছিল না, আজও নেই। কিন্তু অনেকখানি কমানো সম্ভব। শারিরীক, মানসিক, আধ্যাত্মিক ও যৌন প্রয়োজন জীবনের বিভিন্ন দিক-এর প্রত্যেকটির স্বকীয়তা আছে । শারীরিকভাবে ভাল থাকা, সুষম খাবার, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম ও যথেষ্ট সুনিদ্রার উপর নির্ভরশীল । চর্বিযুক্ত বিশেষ করে এ্যানিম্যাল ফ্যাটযুক্ত খাবারে কোলেষ্টোরোল এবং লিপিড বেশী থাকে । এসব বেশী খেলে রক্তের শিরার মধ্যে চর্বি জমে তা সরু হয়ে যায় ফলে হার্ট এ্যাটাক, স্ট্রোক ও ব্লাড প্রেসার হতে পারে । রেড মিট, ডেইরীর খাবার, ডিম, নারিকেল, চিংড়ি মাছে যথেষ্ট কোলেষ্টোরেল থাকে । যথেষ্ট লবন খেলে শরীরে পানির পরিমান বৃদ্ধি পেয়ে উচ্চ রক্তচাপ হতে পারে । আলু, মিষ্টান্ন ও ভাত শরীরের ভিতরে সুগারে রূপান্তরিত হয় । এসব সুগার ইনসুলিনের সাহায্যে কোষের মধ্যে প্রবেশ করে শরীরে শক্তি যোগায় । কিন্তু এসব বেশী খেলে অনেক ইনসুলিনের দরকার হয় । এক সময় শরীর তা যোগান দিতে পারে না, ফলে রক্তে সুগারের পরিমান অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায় এবং প্রসাবের সাথে তা বের হতে থাকে । ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার এটি একটি কারণ । প্রোটিন দেহের ক্ষয় ক্ষতি পূরণের জন্য প্রয়োজন কিন্তু প্রয়োজনের থেকে বেশী গ্রহন করলে শরীরের ওজনও বেড়ে যায় । আর প্রয়োজনের বেশী প্রোটিন শরীরের মধ্যে গ্লকোজ রূপান্তরিত হয়। শুধুমাত্র প্রয়োজনমত প্রোটিনই প্রত্যহ গ্রহন করা উচিত। সুষম খাবার খেলে ভিটামিন এবং স্বাভাবিকভাবেই খনিজ পদার্থের কোন অভাব হয় না । ফল ও তাজা শাক সবজিতে যথেষ্ট ভিটামিন ও এন্টি অক্সিসেন্ট থাকে। এসব আমাদের যৌবন ধরে রাখতে, কোষ্টকাঠিণ্য থেকে মুক্ত রাখতে ও কিছু কিছু ক্যান্সার প্রতিহত করতে সাহায্য করে । নিয়মিতভাবে এবং ক্ষুধার্থ হলেই শুধু খাবার খাওয়া উচিত । খাবারের পর পরই প্রচুর পানি পান করা উচিত নয় । অন্ততঃ ২০-৩০ মিঃ পরে পানি পান করা উচিত। পরিমিত পরিমান পানি যথেষ্ট বিরতি দিয়ে দিয়ে পান করা উচিত ।
ধর্মীয় বিশ্বাস, অনুশাসন ও তার অনুশীলন মানুষকে সুশৃঙ্খল, বিবেচক ও সৎ থাকতে সাহায্য করে । প্রত্যেকেরই তার নিজের ধর্মের প্রতি অটল বিশ্বাস থাকা উচিত এবং তার অনুশীলনও করা উচিত । এতে অন্যের প্রতি ভালবাসা, ক্ষমা করার ক্ষমতা ও সহ্যশক্তি বৃদ্ধি পায় । নিজের চেয়ে কম ভাগ্যবানদের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে সাহায্য করে । একজন ধার্মিক মানুষ জীবনের স্বাভাবিকতা, সামাজিকমূল্যবোধ সম্বন্ধে যেমন জ্ঞানী হয় তেমনি সেগুলিকে সমুন্নত রাখতে সজাগ থাকে ও জীবনের অনিশ্চয়তাকে ভয় পায় না ।
কায়িক পরিশ্রম শুধু যে শরীরের অঙ্গ প্রতঙ্গগুলি সতেজ ও কর্মক্ষম রাখে তাই না, মানসিকভাবেও উফুল্ল থাকতে সাহায্য করে । কায়িক পরিশ্রম ইনসুলিন ছাড়াই রক্তের বাড়তি সুগার ব্যবহারে সাহায্য করে । বয়স এবং শারিরীক অবস্থা ও সুযোগ অনুযায়ী ফ্রি হ্যান্ড ব্যায়াম, হাটা, সাঁতার কাটা ও বিভিন্ন প্রকারের খেলাধূলা অথবা বাগানে বা মাঠে কাজ করা যেতে পারে। অবসর সময়ে নিজের পেশা ছাড়া অন্য যা কিছুই করা যায় তাই আনন্দদায়ক হয় । এসব শরীরের ও মনের অবসাদ দূর করে। গান গাওয়া, ছবি আঁকা, লেখা ও বাদ্যযন্ত্র বাজান মানসিক অবসাদ দূর করে এবং আনন্দ দান করে। গান বাজনা শোনা এবং মুভি দেখাতেও অনেক রিক্রিয়েশান হয় । কোন মানুষই স্নেহ ভালবাসা ছাড়া স্বাভাবিকভাবে জীবন যাপন করতে পারে না । গবেষণাতে দেখা গেছে যে বিবাহিত মানুষ তুলনামূলকভাবে বেশী দিন বাঁচে। স্বামী/স্ত্রী, সন্তান, আত্মীয় স্বজন ও বন্ধু বান্ধবদের সাথে সুসম্পর্ক থাকলে মানসিক বা সাইকোলজিক্যাল স্বাস্থ্য ভাল থাকে। যৌন অতৃপ্তি, অসুস্থতা, মানসিক অশান্তি, বাহ্যিক দুর্ব্যবহার ও খিট খিটে মেজাজ সৃষ্টি করে । নিদ্রা স্বাভাবিক স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য অপরিহার্য । ৫-৬ ঘন্টা ঘুম যথেষ্ট বলে মনে করা হয় । পরিমিত কায়িক পরিশ্রম ও সময়মত শুতে যাওয়া সুনিদ্রার জন্য খুবই প্রয়োজন ।
সর্বপরি মনে রাখতে হবে যে পৃথিবীতে মানুষের জীবন কুসুমাস্তীর্ণ নয় একেবারে কন্টকাকীর্ণও নয় । চাহিদা মোতাবেক সব কিছু পাওয়া না যেতে পারে । স্বাচ্ছন্দ এবং প্রাচুর্যের মধ্যে একটা সীমারেখা থাকতে হবে । প্রথমটির পরিমান নির্ধারণ করা যায় কিন্তু দ্বিতীয়টির কোন শেষ নেই আর বেশীরভাগ ক্ষেত্রে তা থেকে জন্ম নেয় সব অশান্তি। আমরা যেমন জন্ম গ্রহন করি তেমনি দেহত্যাগও করি। পথিবীতে অবস্থান কালের পরিমাণ একজন থেকে অন্য জনের কম বা বেশী । তাই চেষ্টা থাকা উচিত অবস্থানকালীন সময়টুকু যেন দৈহিক, মানসিক ও আধ্যাত্মিক অবস্থা ভাল রেখে জীবনটাকে আনন্দময়, উপভোগ্য এবং ফলপ্রসু করা। সমাপ্তির যত কাছা কাছি সময় অবধি এসব থাকে ততই মঙ্গল । তাই কতদিন বাঁচব বা এ পৃথিবীতে থাকব তার থেকে বেশী কাম্য কেমনভাবে থাকব। সেইটাই বড় কথা ।


0 Comments