ধর্ম, সমাজ ও ভিক্ষাবৃত্তি
ছোটবেলায় পাবনা শহরের টাউনহলের সামনের ভিক্ষুকদের পবিত্র রমজান মাসে হাঁক-ডাক ছেড়ে বলতে শুনতাম “বাবারা এক পয়সা দিলে সত্তর পয়সা পাওয়া যায়।” সারাদেশে দিনের পর দিন সেই ভিক্ষাবৃত্তি বৃদ্ধি পেয়ে আজ একটি সামাজিক সমস্যা তথা ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। যুবক-যুবতী, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, বালক-বালিকা, দুগ্ধপোষ্য শিশুসহ সকল শ্রেণীর মানুষেরই একটা অংশ বিভিন্ন ফন্দি-ফিকিরে এই পেশায় সম্পৃক্ত হয়েছে। শারীরিকভাবে অসুস্থ এবং বিকলঙ্গ শ্রেণীর মানুষের তো কথাই নেই। পৃথিবীতে যে দুইটি পেশা সবচেয়ে নিকৃষ্ট তা হলো বেশ্যাবৃত্তি এবং ভিক্ষাবৃত্তি। সামাজিক এবং ধর্মীয় দৃষ্টিতে বেশ্যাবৃত্তি সবচেয়ে পাপ-পঙ্কিল এবং ভিক্ষাবৃত্তি সবচেয়ে ঘৃণিত পেশা। আমাদের ধর্মে ভিক্ষাবৃত্তিকে সর্বতোভাবে নিরুৎসাহিত করা হলেও দেশে ধর্মীয় অনুভূতিকেই বেশি ব্যবহার করে ভিক্ষাবৃত্তি চালানো হচ্ছে এবং একাজে সদা-সর্বদা আল্লাহ-রাসুলের নামসহ কালেমা পর্যস্ত পাঠ করে ভিক্ষা চাওয়া একটি রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। অথচ আমাদের নবীজি ভিক্ষা করতে বা ভিক্ষা দিতে নিষেধ করেছেন। তার একটি উদাহরণ হলো- “একবার নবীজির কাছে একব্যক্তি তার পরিবার-পরিজন উপোষ আছে বলে ভিক্ষা চাইলে, নবীজি তাকে ভিক্ষা না দিয়ে বললেন, তোমার ঘরে কি কিছুই নাই? রাতের শীত নিবারণের জন্য একটি কম্বল ছাড়া তার কোন সম্বল নেই বলে ভিক্ষুক জানাবে নবীজি ঐ কম্বলটিই নিয়ে আসতে বললেন। অতঃপর কম্বল নিয়ে এলে কম্বলটি বিক্রি করে অর্ধেক দামে ভিক্ষুকের পরিবারের খাবার কিনে বাকি অর্ধেকে একটি কুঠার কিনে নবীজি তার হাতে দিয়ে বললেন, যাও এখন হতে রোজ বন হতে কাঠ কেটে এনে বাজারে বিক্রি করো, দেখবে তোমার অভাব থাকবে না।” কিন্তু আমাদের সমাজ আজ নবীজির সেই শিক্ষায় শিক্ষিত না হয়ে দেশে লাখ লাখ ভিক্ষুক তৈরি করেছে। আর এক শ্রেণীর লোক আছে যারা মনে করে যেখোনে সেখানে যেনতেন ভাবে রাস্তাঘাটে ভিক্ষা দিলেই তাদের সওয়াব হবে। অনেকে আবার সহানুভূতিশীল হয়ে ভিক্ষা প্রদান করলেও অন্য একশ্রেণীর লোক আছে যারা দিনরাত ডান-বাম করে অবৈধভাবে উপার্জন করে মনে করে যে হাত খুলে কিছু ভিক্ষা দিলেই তাদের বাকি আয়-রোজগার জায়েজ হয়ে যাবে। এভাবেই একশ্রেণীর মানুষ ভিক্ষাবৃত্তিকে উৎসাহ যোগাচ্ছে। কিন্তু তাতেও কোন অসুবিধা ছিল না যদি এভাবে ভিক্ষাবৃত্তি একটি জাতীয় সমস্যা বা ব্যাধিতে পরিণত না হতো। এছাড়া ভিক্ষাবৃত্তি ক্ষেত্রবিশেষে একটি লাভজনক ব্যবসাতেও পরিণত হয়েছে। একবার একজন শিল্পপতি যিনি গাজীপুরে একটি বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা তিনি পুলিশের সহায়তায় শ’ দুয়েক ভিক্ষুককে রাস্তা হতে তুলে নিয়ে তার পুনর্বাসন কেন্দ্রে নিয়ে গেলেন। সেখানে তাদের খাওয়া-দাওয়া, চিকিৎসাসহ সবকিছুরই সুব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও ঐসব ভিক্ষুকেরা দিনরাত জুড়ে তাদেরকে ছেড়ে দেয়ার জন্য কান্নাকাটি শুরু করে দিল। পুনর্বাসন কেন্দ্রটির মালিকসহ যাকে যখন ঐ ভিক্ষুকেরা পায় তাকেই তখন হাতে পায়ে ধরে কান্নাকাটি জুড়ে দেয় সেখান থেকে বের হওয়ার জন্য। কারণ হিসাবে তারা জানান যে, তাদের প্রত্যেকেরই ভিক্ষা করে দৈনিক ৪/৫ শত টাকা আয় হয়, এখানে থেকে তাদের ঐ টাকা মারা যাচ্ছে। এমতাবস্থায় ঐ পুনর্বাসন কেন্দ্রের ভিক্ষুকদের কান্না আহাজারির বেলায় শেষ পর্যস্ত একজনকেও সেখানে রাখা সম্ভব হয়নি। এইসব ভিক্ষুকদের আবার গডফাদারও আছে। রাজধানীতে ভিক্ষুকদের গডফাদাররা ভিক্ষার বিভিন্ন পয়েন্ট বন্টন করে এবং ঐসব বরাদ্দকৃত জায়গায় অন্য কেউ বা নতুন কোন ভিক্ষুক ভিক্ষা করতে পারে না। এমনকি ঐসব গডফাদাররা বিভিন্ন স্থানে অচল বিকলাঙ্গ ভিক্ষুকদের বসিয়ে দিয়ে আবার সময়মত তুলে নিয়ে যায়। এছাড়া একশ্রেণীর যুবামহিলা অন্যের দুগ্ধপোষ্য শিশু ভাড়ায় নিয়ে এসে রাস্তার মোড়ে মোড়ে, সিগনালে দাঁড়িয়ে ঐসব শিশুর দুধ কেনা, খাদ্য কেনা বা চিকিৎসার জন্য টাকা চায়। এভাবেই সারাদেশে বিশেষ করে রাজধানীতে ভিক্ষাবৃত্তি এতোটা প্রকট আকার ধারণ করেছে যে, এরা নিত্য নতুন কায়দায় যেকোন ট্রাফিক সিগন্যাল, মার্কেট, রাস্তার মোড়, ধর্মশালা বা মাজারের গেট ইত্যাদি স্থানে জনজীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে। ট্রাফিক সিগন্যালে গাড়ি থামলে এরা দলে দলে হুমড়ি খেয়ে পাড় এবং আরোহীর দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য গাড়িতে এতোজোরে টোকা বা থাপ্পড় দেয় যে, অনেকেই গাড়ির ভিতরে চমকে ওঠেন। আবার অনেকে ভিক্ষা না পেলে হাতে থাকা খুচরো পয়সা বা অন্য কিছু দিয়ে গাড়ির সুন্দর রং অঁচড়িয়ে নষ্ট করে দেয়। অনেককেই আবার শরীরের দগদগে সংক্রামক ঘানিয়ে বা বিকৃত অংশ প্রদর্শন করে শিক্ষা চায় দেখে অনেককেই শিউরে উঠতে হয়। দিনের পর দিন এসবের সংখ্যা বেড়েইে চলেছে। আর রমজান মাস এলে তো কথাই নেই! সারাদেশ হতে রাজধানীতে তখন এতো ভিক্ষুক এসে জমা হয় যে, এদের জ্বালায় পথচলা মুশকিল হয়ে পড়ে। রাস্তার মোড়ে বা ট্রাফিক সিগন্যালে এদের জটলাতেও খানিকটা ট্রাফিক জ্যামের সৃষ্টি হয়।
ধর্মীয় অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে প্রাগৈতিহাসিক কাল হতে ভিক্ষাবৃত্তি চললেও আমাদের দেশে এই পেশা এখন লাগামহীন হয়ে জাতীয় জীবনকে কলুষিত করতে বসেছে। একজন বিদেশী যখন রাস্তা দিয়ে চলার সময় এহেন দৃশ্য দেখেন তখন স্বভাবতই আমাদের দেশ ও জাতি সম্বন্ধে নীচু ধারণা পোষণ করেন। আজ এখন তাই এ নিয়ে চিস্তা-ভাবনার সময় এসেছে। এভাবে ভিক্ষুকদেরকে পেশাদারিত্বে ছেড়ে দিলে জাতীয় একটি উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ ভিক্ষাবৃত্তিকে বেছে নিবে।
এতাবস্থায় অক্ষম, বিকলাঙ্গ ব্যক্তিদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করে সক্ষম পেশাদার ভিক্ষুকদের নির্মূল করতে না পারলে স্বাধীন সার্বভৌম দেশ হিসাবে আমাদের উঁচু মাথা হেঁট হয়ে যাবে। এ বিষয়ে ধর্মীয় গুরুদেরও এগিয়ে আসতে হবে। মসজিদ, মন্দির, গীর্জায় ভিক্ষাবৃত্তিকে নিরুৎসাহিত করে বক্তব্য দিতে হবে। বিশেষ করে কেউ যাতে সক্ষম ব্যক্তিকে ভিক্ষা দিয়ে তার কর্মক্ষমতাকে পঙ্গু করে না দেয় সেকথা জোরে-শোরে বলতে হবে। ধর্ম যে ভিক্ষাবৃত্তির বিপক্ষে সেকথাও ধর্মীয় উপাসনালয়সহ বিভিন্ন স্থানে বলতে হবে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়কেও এ কাজে এগিয়ে আসতে হবে। প্রয়োজনে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সক্ষম ভিক্ষুকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে এবং অক্ষমদের ধরে পুনর্বাসন কেন্দ্রে পাঠাতে হবে। সকলকেই একথা বুঝতে হবে যে, “নবীর শিক্ষা করোনা ভিক্ষা মেহনত করো সবে।” যে হাতে আল্লাহ রাসুলের নাম নিয়ে ভিক্ষা চাওয়া হয়, বিশেষ করে সক্ষম সেই হাতগুলো কাজের হাতে পরিণত হলে সমাজের জন্য তা মঙ্গল বয়ে আনবে সেই সাথে জাতীয় মর্যাদাও বৃদ্ধি পাবে।
- মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন

0 Comments