“ নিরব ঘাতক : অবসেশন ”
লেখক : মৃত: অধ্যাপক ডাঃ এ এইচ মোহাম্মদ ফিরোজ ।
( তিনি জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনষ্টিটিউট, ঢাকা, পরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন । )
‘আমি মাটি, মানুষ খাটি, আমি দাফন , মানুষ কাফন, আমি খড়ি, মানুষ পড়ি, আমি মোর্দার, মানুষ উদ্ধার’ কেউ আমার সামনে পায়খানা খেলে গো-গবর আমার খাইতে হয়’ । ‘আমার সামনে আগুন, সিগারেট খাইলে তাৎক্ষনিক আমার বলতে হয় আমারে আগুন জ্বালায় দাও । এমনকি আগুন দেখলে বলতে হয় আমাগো আগুন দিয়া জ্বালায় দাও । এই কথা অনেক সময় নবীজির উপর প্রভাব পড়ে । অর্থাৎ নবীজিকে বলি আগুন দিয়া জ্বালায় দাও । তাই বাধ্য হয়ে বলি সবাইরে আগুন দিয়া জ্বালায় দাও’। আমারে জাহান্নাম দাও; সবাইরে জান্নাত দাও । আমি নাড়া, মানুষ চাড়া’ ।।
...............পাঠকগণ,উপরের কথাগুলো আমার এক রোগির ।
মানুষ বাধ্য বাধ্যকতায় অনেক সময় নানা কথা বলতে বাধ্য হয়। কথার বাধ্যতা কিংবা কাজের বাধ্যতা যখন বাধ্যবাধকতায় পরিণত হয় তখনই এটাকে ‘অবসেশনাল থট’ বা অবসেশনাল এ্যাক্ট’ বাংলা যাকে বলা হয় বাধ্যবাধক চিন্তা বা বাধ্যবাধক কাজ। আরো বড় পরিসরে যাকে বলা যায় অবসেশন। বাংলাদেশের জনসংখ্যার শতকরা ৩ ভাগ বাধ্যগতচিন্তা বা বাধ্যগতকাজ (অবসেশন) রোগে আক্রান্ত। বিপুল জনগোষ্ঠীর শতকরা ৮০ ভাগ লোকই এটি বুঝতে পারেন না। বিশেষতঃ এটি যে একটি
মানসিক রোগ এ ব্যাপারটি অনেকের বোধগম্য সৃষ্ঠির আদিকাল থেকে বলা যায় যখন থেকে মানুষ পৃথিবীতে এলো তখন থেকেই মানসিক রোগ তার পিছু ধরলো। বিশ্বের ক্রমবিন্যাসের
বিভিন্ন স্তরে মানসিক রোগের বিকাশ বিভিন্ন রকম । আজ-কালকার বিশ্ব। নাগরিকদের যারা মানসিক রোগে আক্রান্ত তাদের উপসর্গগুলো হয় খুব সূক্ষ, কাব্যময়। এগুলো সাধারণভাবে প্রভাবিত করে রোগীর চিন্তাধারাকে। এমনি একটি রোগ অবসেশন। এই রোগটিতে রোগীর চিন্তাধারার ব্যাঘাত ঘটে। নানা রকম কাল্পনিক, অভূতপূর্ব চিন্তা তাদের মনে আসে, তারা নিজেরা এটিকে বন্ধ করতে চায়, কিন্তু পারে না। এচিন্তাগুলো শব্দ হতে পারে, একটি বাক্য হতে পারে, এমনকি একটি কথাও হতে পারে।
পাঠকগণ এর প্রকৃষ্ঠ উদাহরণ চিঠিটি। বারংবার এই চিন্তাগুলো ব্যক্তির মনকে আচ্ছন্ন করে ফলে ব্যক্তি “চিন্তাক্লান্ত” হয়ে পরে। অনেক ক্ষেত্রে এ অবস্থায় তারা উত্তেজিত হয়ে যায় কিংবা আত্মহত্যার প্রচেষ্টা চালায়। চিন্তার এই বাধ্যাবাধকতা রোগে যারা আক্রান্ত হন, তাদের শারীরিক স্বাস্থ্যে কোনো অসুখ প্রকাশ পায় না। কিন্তুু তার কাজকর্মে দারুণ ব্যাঘাত ঘটে। অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তি তার কাজ ছেড়ে দিয়ে চিন্তা করার কাজে ব্যস্ত হয়ে যায় ।
অবসেশন একটি নিবরঘাতক। এই ঘাতকটি কোনো রকম নিজের ইচ্ছা নেই। যাকে খুশি, যখন খুশি আক্রমন করতে পারে। রোগটিরও কোনো বিশেষ পছন্দ নেই। ধনী -দরিদ্র , ছেলে-মেয়ে নির্বিশেষে তার হনন প্রক্রিয়া চালু রাখে। তবে রোগটি কম বয়সী ছেলে-মেয়েদের বেশি পছন্দ করে। মানসিক রোগ যে কয়টি বংশানুক্রমিকভাবে বিস্তার লাভ করে তার মধ্যে অবসেশন একটি। স্ত্রী লিংগের প্রতি এই রোগটি একটি বিশেষ আর্কষণ রয়েছে। চিন্তা বাধ্য-বাধকতা ছাড়াও অনেক ক্ষেত্রে কাজের বাধ্য-বাধকতাও এই রোগটিতে পাওয়া যায়। কাজের বাধ্য-বাধকতার একটু ব্যাখ্যা করি - যে কাজটি একবার করলেই চলে বা একবারই সমাধা হয়ে যায় সে কাজটি একাধিকবার কিংবা বারংবার করাই এই রোগটির প্রধান বৈশিষ্ট। যেমন - কোনো ময়লা হাতে লাগলে ধুয়ে ফেলা, এই ধৌত কাজটি সম্পাদন করতে একবারই যথেষ্ট। না হউক দুইবার। কিন্ত ব্যক্তি যদি কাজটি সম্পাদন করতে বেশ কয়েকবার সময়নেন অথবা কাজটি বারংবার করা অব্যাহত রাখেন,এর পিছনে বেশ সময় ব্যয় করেন । তখনই বাধ্য-বাধক কাজের রোগ বা অবসেশন বলা হয় ।
অবসেশন রোগের উপসর্গ :
শুচিবায়ু রোগের কথা আমরা অনেকেই জানি। গ্রামে-গঞ্জে শহর বন্দরে এই রোগটি ‘শুচিবায়ু’রোগ নামে পরিচিতি ।
এই রোগে যারা ভোগে তারা সাধারণত একই কাজ বার বার করে । তাদের ধারণা কাজটি সম্পুর্ণ হয়নি বা মনমত করতে পারেনি । যেমন - হাত ধোয়া, ঘরের তালা লাগানো,যে কোনো জিনিস পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করা ইত্যাদি । অনেক সময় দেখা যায় তারা ঘন্টার পর ঘন্টা একই ধরণের কাজ করে চলছে । আবার কতক ক্ষেত্রে তাদের মাথায় একটা চিন্তা ঢুকলে সে চিন্তাই বার বার করতে থাকে এবং প্রায় সারা দিনই সে চিন্তা করে । রোগী নিজে জানে এ চিন্তা অনর্থক, অর্থহীন । তবুও কতকটা যেন বাধ্য হয়ে এ চিন্তা তাকে করতে হয় । অনেকের চিন্তার ধরণ ধর্মীয় বিষয় নিয়েও হতে পারে । যেমন - কেউ নামাজ পড়তে বসলে তাৎক্ষণিকভাবে তার মনে হয় আল্লাহ নেই ইত্যাদি । অবসেশন বা শুচিবায়ু রোগে যারা ভোগে তারা সাধারণত সিদ্ধান্ত নিতে দেরী করেন, কাজকর্ম ধীর গতিতে করেন, একটু বদমেজাজি থাকেন এবং সর্বদা টেনশন করেন ।
রোগের কারণ সমূহ :
* বংশগত
* মস্তিস্ক সংক্রান্ত বিভিন্ন জটিলাতা
* মস্তিস্কের কার্যক্রমের জটিলতা
* বিভিন্ন ধরণের নিউরোট্রান্সমিটার সংক্রান্ত জটিলতা
* বাল্যকালের শুভ কিংবা অশুভ অভিজ্ঞতা
* অবচেতন মনের বিভিন্ন রকম কার্যক্রমের ব্যাঘাত ও কিছু চিন্তাগত সমস্যা
চিকিৎসা :
অত্যাধুনিক কিছু ঔষধ অবসেশন রোগে ব্যবহার করা হয় । যেমন - পারঅক্সিটিন, ক্লোমিপ্রামিন, সারট্রালিন ইত্যাদি । এছাড়াও নানাবিধ থেরাপি যেমন- সাইকোথেরাপি, বিহেভিয়ার থেরাপি ও কগনেটিভ থেরাপি ব্যবহার করা হয় । কতক জটিল ক্ষেত্রে সার্জারীর মাধ্যমে মস্তিস্কেও অপক্রিয়ায়রত কিছুটা অংশ কেটে ফেলা হয় ।
রোগটির ফলাফল :
শতকরা ৬৬ভাগ ক্ষেত্রে রোগটি এক বছরের মধ্যে সেরে যায়। বাকি ৩৪ ভাগ ক্ষেত্রে রোগটি একাধিক বছর ধরে চলতে থাকে। তবে কতকক্ষেত্রে এটি সারাজীবন চলতে পারে ।
পাঠকগণ, নিরব ঘাতক এই রোগটির আজই সূচিকিৎসা নিন । মনে রাখবেন অপচিকিৎসা ও চিকিৎসা না নেওয়ায় রোগটিকে জটিল করে রোগভোগের মেয়াদ দীর্ঘায়ূ করে ।।
( লেখাটি চিত্রা বিচিত্রায় পৃর্বে প্রকাশিত ।)


0 Comments