সর্বশেষ

6/recent/ticker-posts

Header Ads Widget

লেখাপড়ার একাল সেকাল



 লেখাপড়ার একাল সেকাল

  -এস এম রইজ উদ্দিন আহম্মদ ।

মানুষ মাত্রই অতীত প্রিয়। বর্তমান সময়টা যতই যাতায়াত, বিনোদন, আহার-বিহার, যোগাযোগ, লেখা-পড়া দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক উন্নয়নে সহায়ক হোক না কেন প্রবীণদের বলতে শুনি আগের দিনগুলোই ভাল ছিল। এ ধরনের উক্তি, চিন্তা বা চেতনা একান্ত মনের অনুভুতির ব্যাপার। মানব সভ্যতা সৃষ্টি বা উন্নয়নে লেখাপড়ার অবদান অনস্বীকার্য। যে জাতি যত শিক্ষিত সে জাতি তত উন্নত। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা (পাকিস্তান) লাভের প্রাক্কালে শিক্ষার হার বড়জোর ১২/১৩ ভাগ ছিল। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা লাভের সময় বাংলাদেশের শিক্ষার হার ছিল মাত্র ১৮-১৯ ভাগ। বর্তমানে গড়পরতা শিক্ষার হার দাড়িয়েছে ৪০ ভাগের উপর। সাক্ষরতার হার ৬০ ভাগের বেশি। তুলনামূলকভাবে পার ক্যাপিটাল ইনকাম তথা মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পেয়েছে। দ্রব্যমূল্য আকাশ ছোঁয়া হওয়া সত্বেও কোন জিনিস অবিক্রিত অবস্থায় পড়ে থাকছে না। চাল, ডাল তৈলসহ নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিষের দাম গত এক বৎসরে ক্ষেত্র বিশেষ ২/৩ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এতদসত্বেও মানুষ না খেয়ে মরার খবর পাওয়া যায়নি অথবা লঙ্গরখানা খুলে খাবার বিতরণ করা হচ্ছে এমনটিও শোনা যাচ্ছে না। এতে প্রতীয়মান হয় শিক্ষার হার বৃদ্ধির সাথে সাথে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষের আয় বৃদ্ধি পেয়েছে। এক্ষেত্রে বিদ্যা-শিক্ষা বিশেষ করে প্রযুক্তি নির্ভর শিক্ষার অবদান অনেক বেশি। পৃথিবীর প্রায় সকল ধর্মে বিদ্যার্জনকে প্রায়োরিটি দেয়া হয়েছে। ইসলাম ধর্মের প্রথম বাণীই ‘ইকরা’ দিয়ে শুরু হয়েছে। প্রযুক্তি নির্ভর জ্ঞান অর্জনের জন্য সুদূর চীন দেশে গমনের জন্য পরামর্শ দেয়া হয়েছে। অপরদিকে প্রত্যেক নর-নারীর জন্য বিদ্যার্জনকে আবশ্যকীয় (ফরজ) করা হয়েছে। হিন্দু ধর্মেও আত্ম নং বৃদ্ধি’ বা ‘ছাত্র নং অধ্যয়নঃ তপঃ বলা হয়েছে।

বঙ্কিম বাবুতো বিদ্যাদেবীর আরাধনায় মগ্ন-

যা দেবী সর্বভুতেষু বিদ্যারূপেন সংস্থিতা

নমস্তৈস্যই নমস্তৈস্যই নমঃ নমঃ


ব্রিটিস পূর্ববর্তীকালে ভারতবর্ষে বসবাসরত মুসলমানদের প্রায় শতভাগ শিক্ষিত ছিল। সে সময়ে মুসলমানদের মধ্য হতে একজন গরীব মানুষ খুঁজে বের করা ছিল কষ্টকর। পরবর্তীতে তথাকথিত সিপাহি বিদ্রোহের পর ( ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম) উইলিয়াম হান্টার প্রণীত “দি ইন্ডিয়ান মুসলিম” নামক রিপোর্ট দেখা যায় কোম্পানির এক’শ বছর  রাজত্বের পর মুসলমানদের শিক্ষার হার শূন্যের কোটায় এবং মুসলমানদের মধ্য হতে একজন ধনবান ব্যাক্তি খুজে পাওয়ার কষ্টকর। পরাধীন ভারতবর্ষে ঊনবিংশ শতাব্দি পর্যন্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা একবারে নগণ্য ছিল। ১৮৭০ সালের গ্রাম চৌকিদারী আইন, ১৮৮৫ সালের বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ত্ব আইন ও বঙ্গীয় স্বায়ত্ব্ শাসন আইন পাশের ফলে এদিকে যেমনি দখলীয় জমিতে প্রজাস্বত্ব বা রায়তি স্বত্ব স্বীকৃত হলো অপরদিকে তেমনি ইউনিয়ন কমিটি, মহাকুমা পর্যায়ে লোকাল বোর্ড এবং জেলা পর্যায়ে জেলা বোর্ড গঠিত হলো। এসব প্রতিষ্ঠানের ফলে শিক্ষা প্রসারকল্পে ধীরে ধীরে স্কুল, মক্তব, টোল, চতুষ্পাটী, মাদ্রাসা গড়ে উঠতে লাগলো এবং যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নতি সাধিত হতে থাকলো। ফলে ভারত বর্ষে শিক্ষার হার বেড়ে চললো। মানুষের মধ্যে ছেলেমেয়েকে লেখাপড়া শেখানোর একটি আগ্রহের জন্ম নিতে থাকলো। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক দুরত্বে স্থাপিত হওয়ার এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো না থাকায় শিক্ষা সার্বজনীন রুপ লাভ করতে পারেনি। শিক্ষার হার বাড়ার সাথে সাথে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়ে চললো। গ্রামে গ্রামে মক্তব, টোল-চতুষ্পাটী, মাইনর স্কুল, ফ্রি প্রাইমারি স্কুল, পাঠশালা ইত্যাদি প্রতিষ্ঠিত হতে থাকলো। বাবা মা কষ্ট স্বীকার করে দুই একটি ছেলেকে এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে লাগলো। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছিল না আসবাবপত্র - না ছিল বসার বেঞ্চ। শুধু কী তাই প্রয়োজনীয় পাঠ্যপুস্তকও ছিল না।  শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাসিক বেতন, বই, কাগজপত্র কেনা, যাতায়াত সমস্যার ইত্যাদি কারণে প্রাইমারির গন্ডি ছেড়ে হাইস্কুলে খুব কম সংখ্যাক ছাত্র ভর্তির সুযোগ পেত। স্কুল, কলেজ বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দূরত্ব বেশি হওয়ার ফলে স্থানীয় লোকজন ছাত্রদের জায়গীর দিতো। গৃহশিক্ষক ছাত্রটি ঐ বাড়ির একজন হয়ে বসবাস করতো। বাড়িওয়ালা লজিং মাষ্টারকে নিজের ছেলের মতই দেখতো। পান্তাভাত বা মিষ্ঠি আলু সিদ্ধ খেয়েই গ্রামের এসব ছাত্ররা পড়াশুনা করতো। মাদ্রাসায় লিল্লাহ বোডিং এর ব্যবস্থা ছিল। লজিং মাস্টার লজিং বাড়িতে লাঙ্গল চাষ, ধান কাটা, ধান মাড়াই, ধান ভাঙ্গা প্রভৃতি কাজে সাহায্য করতে মোটেই লজ্জাবোধ করতো না। অনেক সময় ছাত্রটি গরিব হলে লজিং মাস্টার তাকে লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়ার জন্য আর্থিক সাহায্যও করতো। একটা গভীর আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিল বিরাজমান। ছুটিতে বা পূজা পার্বণ বা ঈদের সময় উভয় বাড়ির লোকজন বেড়াতে যেত। অবশ্য দুইটি ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম ঘটতো না তা নয়। যাতায়াত ব্যবস্থা খারাপ থাকায় বর্ষাকালে স্কুলে যাতায়াত বড়ই কষ্টের ছিল। কর্দমাক্ত রাস্তা, বৃষ্টি হচ্ছে, পা ফসকে পড়তে হয়। ছাত্ররা গামছা পরে কাদা পানি ঝাঁপিয়ে স্কুল বা কলেজে আসতো। তারপর কাপড় বদলিয়ে নিত। কাপড় বলতে বড়জোর পাজামা-জামা। অধিকাংশ ক্ষেত্রে পাজামার পরিবর্তে লুঙ্গি পরতো। শহর ছাড়া গ্রামের ছাত্রদের মধ্যে দুই একজন ফুলপ্যান্ট পরতো। ছাত্র-শিক্ষকের মধ্যে একটি গভীর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাবোধ বিরাজ করতো। শিক্ষকরা কোন কাজ করে দিতে বললে ছাত্ররা দল বেধে তা করে দিয়ে আসতো। প্রাইভেট পড়ানোর কোন বালাই ছিল না। প্রাইভেট পড়ানোকে শিক্ষকরা খুব হীন কাজ মনে করতো। ছাত্ররা প্রয়োজানে শিক্ষকের বাড়িতে যেত। শিক্ষক তাদের বারান্দায় বা উঠানোর গাছের ছায়ায় মাদুরের পর বসিয়ে দিয়ে পড়তে বলে নিজের কাজ করে বেড়াতেন। সুযোগ মত এসে পড়া দেখিয়ে দিয়ে যেতেন। প্রাইভেট পড়ানো বাবদ কোন টাকা নিতেন না। টাকা নেয়াকে ছোট কাজ মনে করতেন। কেউ দিতে চাইলে অপমান বোধ করতেন। তবে হ্যাঁ ভালবেসে শ্রদ্ধার সাথে কেউ যদি বাড়ির পুকুরের বা বিলের মাছ, গাছের ফল-পাকড়া বা তরিতরকারী নিয়ে যেত তাতেই শিক্ষক বেজায় খুশি হতেন। অনেক শিক্ষক স্কুলের ভাল গরিব মেধাবী ছাত্র দেখে দুই একজনকে নিজের বাড়িতে রেখে পড়াতো। সাধারণতঃ একটু অবস্থাপন্ন ঘরের ছেলেরা মহান শিক্ষকতার পেশা বেছে নিতেন ।

অধিকাংশ স্কুলে কাঁচা ঘর কাল বৈশাখীর ঝড়ে উড়ে যেত। অনেক সময় কারো কাচারি বাড়িতে অথবা গাছ তলায় ক্লাস নেয়া হতো। ম্যাট্রকুলেশন পরবর্তীতে এসএসসি পাসের হার খুবই কম ছিল। প্রথম দিকে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে এসব পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হতো। পাকিস্তান লাভের পর প্রথমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরে শিক্ষা বোর্ড স্থাপিত হলে বোর্ডের অধীনে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। প্রথম বিভাগে পাস করা বিরল সৌভাগের ব্যাপার। অন্ততঃ বিশ পঁচিশখানা গ্রামের লোকজন তাকে দেখতে আসতো। এমনকি দ্বিতীয় বিভাগে পাস করলেও গ্রামবাসী দেখা করে তার জন্য দোয়া করতো। স্কুলে এত বেশি পাকা দালান কোটা ছিল না। চেয়ার টেবিল বেঞ্চের বড়ই অভাব ছিল। বিদ্যুৎ তো গ্রামের লোক চোখেই দেখেনি। সত্তরের দশকের আগ পর্যন্ত গ্রামে ভ্যান বা রিক্সার প্রচলনও ঘটেনি। সারা স্কুলে যে দু চারজন ছাত্রের বাইসাইকেল ছিল তারা তো ভাগ্যবান এবং ইর্ষার পাত্র ছিল। মা-বাবা ছাত্রদের ভর্তি করার সময় ছেলেকে শিক্ষকদের হাতে সঁপে দিয়ে আসতো এবং বলতো ছেলে আমার মানুষ করার দায়িত্ব আপনার। প্রয়োজনে, শিক্ষকদের পেটাতে বলতেন শুধু চোখ কান বাদে । শিক্ষকরা ছাত্রদের ভালবাসলেও লেখাপড়া না পারলে খুবই মারপিট করতেন। বেত, কঞ্চি বা খেজুরের ডাগো দিয়ে তৈরি লাঠিতে বেশুমার পেটাতেন। অনেক সময় মারার পর ৪/৫টা ইট মাথায় উঠায়ে দু পা ফাঁক করে দুহাতে কান ধরিয়ে সূর্যের দিকে মুখ করিয়ে দাঁড়িয়ে রাখতেন। যারা তুলনামূলক কম মেধাবী তারা স্কুল হতে পালাতো, আর ত্রিসীমানায় পা রাখতো না। এক সময় প্রবাদ ছিল স্কুল পালালেই রবীন্দ্রনাথ হওয়া যায় না। বিনোদনের তেমন মাধ্যম ছিল না। অধিকাংশ স্কুল বল কিনে দিতে পারতো না। বাতাবি লেবু দিয়ে অনেক সময় বল বানিয়ে খেলা করা হতো। গোল্লাছুট, দাড়িয়াবাঁধা, লাফ ঝাফ এসব খেলার প্রচলন ছিল। মেয়েরা বউছোয়া, এক্কা দোক্কা এসব গ্রাম্য খেলাধুলা করতো। মূলতঃ শহর ছাড়া ষাটের শতক পর্যন্ত মেয়েদের তেমন লেখাপড়ার সুযোগ ছিল না। প্রাইমারী স্কুলের গন্ডি পার হতে না হতেই বিয়ে হয়ে হেত। তখনকার দিনে মেয়েদের উচ্চ শিক্ষার চেয়ে আদর্শ মাতা, ভগ্নি বা জায়া তৈরিতে বাবা-মা সচেষ্ট থাকতেন। স্বাধীনতা লাভের পর গত শতাব্দির সত্তর দশক হতে মেয়েদের শিক্ষার হার বাড়তে থাকে এবং বাল্য বিবাহ কমতে থাকে। আশির দশকে বেশ উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ছাত্রী স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পায়। নব্বইয়ের দশকে ছাত্রী উপবৃত্তির প্রচলন ঘটায়, বাল্য বিবাহ নিরোধে বেশ খানিকটা সফলতা অর্জন করায়, নারী শিক্ষার প্রতি সচেতনতা বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং সর্বপরি চাকুরি ক্ষেত্রে মহিলাদের কোটা বৃদ্ধির ফলে নারী শিক্ষার প্রভুত অগ্রগতি সাধিত হয়। যে সব প্রতিষ্ঠানে সহ শিক্ষা চালু আছে - সে সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছেলেদের চেয়ে মেয়েদের ভর্তি ও উপস্থিতি বেশি দেখা যায়। বোর্ড পরীক্ষাগুলোতে ছেলে মেয়ের পাসের অনুপাত প্রায় সমান সমান। কোন কোন বৎসর বরং ছাত্রীর সংখ্যা বেশি। পূর্বে ম্যাট্রিক বা এসএসসি পাশের পর অনেক ছাত্রের লেখাপড়ার ইতি টানতে হতো। প্রথমতঃ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্বল্পতা, দ্বিতীয়তঃ আর্থিক দৈন্যতা। গত শতাব্দির ষাটের দশক পর্যন্ত মহাকুমা পর্যায়ে একটি করে ডিগ্রি কলেজ স্থাপিত হয়েছিল। অবশ্য সব মহকুমায় ডিগ্রী কলেজ ছিল না। ষাটের দশকের শেষ দিকে এসে দু একটি থানা বর্তমান উপজেলা পর্যায়ে কলেজ প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে। স্বাধীনতা লাভের পর ১৯৭২ সালে হঠাৎ করে স্বল্প সিলেবাস এবং পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণের অভাবে এসএসসি পরীক্ষায় পাসের হার প্রচন্ড রকম বৃদ্ধি পেল। ছাত্র-ছাত্রীদের ভর্তি সমস্য প্রকট আকার ধারন করলো। সদ্য স্বাধীন দেশে সকলের জন্য শিক্ষা চাই। প্রাথমিক শিক্ষাকে অবৈতনিক এবং জাতীয়করণ, বিনামূল্যে পাঠ্যবই সরবরাহ দেয়া হলো। ১৯৭২ সালে নবম শ্রেনী পর্যন্ত নামে মাত্র মূল্য সরকার বইয়ের ব্যবস্থা করলো। শিক্ষাখাতে সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ রাখা হলো। সকল থানা বর্তমানে উপজেলা পর্যায়ে স্বাধীনতা লাভের পর পরই কলেজ স্থাপিত হলো। ছাত্র-ছাত্রীদের উচ্চ শিক্ষার দ্বার উন্মুক্ত হতে শুরু করলো। শিক্ষা বিস্তারে এক প্রকার রেনেসাঁর সূত্রপাত ঘটলো। প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষকরা সরকারি স্কেলে বেতন পায় হেতু প্রাইমারী স্কুলের সংখ্যা বৃদ্ধি পেল বহুগুন। পূর্বে যেখানে দুই তিনটি ইউনিয়ন মিলে একটি উচ্চ বিদ্যালয় স্থাপিত হয়েছিল স্বাধীনতা লাভের পর প্রতি ইউনিয়নে কম করে হলেও একটি উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলো। পূর্বে ছাত্র ছাত্রীদের বেতনের টাকা হতে শিক্ষকদের বেতন দেয়া হতো; এক সময় উচ্চবিদ্যালয়ের বেতনের হার নিু পর্যায়ে নেমে এল। সত্তরের দশক পর্যন্ত ছিল চরম দুর্দিন। ১৯৮১ সালে শিক্ষকদের পদ এবং যোগ্যতা অনুযায়ী বেতন স্কেলের মধ্যে আনা হলো এবং ৫০ ভাগ বেতন সরকার বহন শুরু করলো। 

বর্তমানে বেসরকারী উচ্চ বিদ্যালয়, মাদ্রাসা ও কলেজের শিক্ষক-কর্মচারীগণ সরকারী খাত হতে একশ ভাগ বেতন প্রাপ্ত হচ্ছেন। আশির দশক হতে প্রতিযোগিতামূলকভাবে স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে গ্রাম কিংবা শহরে। আগে ছাত্র-ছাত্রী ভর্তির একটি ব্যাপার ছিল। এখন এটা গৌণ হয়ে দাড়িয়েছে। কোন কোন স্কুল, মাদ্রাস বা কলেজে ছাত্র-ছাত্রীর চেয়ে শিক্ষক কর্মচারীর সংখ্যা বেশি দেখা যায়। পূর্বে এলাকার দানশীল লোকজনের দান আর স্বেচ্চাশ্রমে প্রতিষ্ঠিত হতো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এখন সম্পূর্ণ উল্টো। বেকার যুবকেরা নিজেরা লাখ লাখ টাকা চাঁদা দিয়ে জমি কিনে ঘর বানিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছে। বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগে স্বজনপ্রীতি কারচুপি ও চাঁদাবাজি শুরু হলো। ফলে যোগ্যতাসম্পন্ন মেধাবী শিক্ষক এলো না শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। চাঁদা, এলাকার আধিপত্য, খুঁটির জোর ও রাজনৈতিক তদবিরে অধিকাংশ শিক্ষকের নিয়োগ লাভ। মেধাবী, দক্ষ ও যোগ্যতা সম্পন্ন শিক্ষকের অভাবে শিক্ষার মান নিচে নেমে গেল। এর থেকে পরিত্রাণ লাভের প্রচেষ্ঠা হিসেবে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয়ভাবে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। এখন তুলনামুলকভাবে ভাল শিক্ষক পাওয়া যাচ্ছে। বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করার পূর্বে তাদের নাম নিবন্ধনের জন্য সরকার নিয়ন্ত্রিত একটি রেজিস্ট্রেশন পরীক্ষার অংশ নিতে হচ্ছে। শুধুমাত্র পরীক্ষায় উত্তীর্ণ নিবন্ধনধারী প্রার্থীরা নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ গ্রহণের সুযোগ পাচ্ছে। আশা করা যায়। অদূর ভবিষ্যতে বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মেধাবী পাওয়া যাবে। অপরদিকে সকল শিক্ষকের প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা নেয়ায় মান ভাল হতে চলেছে। এক জরিপে দেখা গেছে কোন কোন প্রভাবশালী ব্যক্তি স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠার নামে প্রচুর চাঁদা আদায় করছে। আদায়কৃত চাঁদার খুব অংশ খরচ করেছেন এবং বাকিটা নিজ পকেটে ঢুকিয়েছেন।

যে কথা বলছিলাম গ্রামের ছাত্ররা শহরের কলেজে এসে ভিড় জমাতো। লজিং অথবা মেসে থেকে চলতো লেখা-পড়া। ফাঁক পেলেই রোজগারের জন্য পরিশ্রম করতে। শহরের অনেক স্কুল-কলেজে নৈশ শাখা ছিল। দিনের বেলা কল-কারখানায়, দোকান বা অন্য কোথায়ও কাজ করে লেখাপড়ার খরচের টাকা আয় করতো আর নাইট স্কুল বা কলেজে পড়তো। বর্তমানে এই সুযোগটি আর নেই। গ্রাম থেকে আসা এসব ছাত্ররা অধ্যবসায় আর পরিশ্রম গুনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আশির দশক পর্যন্ত শিক্ষাগ্রহণের উপর জরিপ করলে দেখা যাবে মেডিকেল কলেজ, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্রামের ছাত্রদের ভর্তির হার ছিল অনেক বেশি। চাকুরী প্রাপ্তির ক্ষেত্রেও গ্রামের ছেলেদের ছিল প্রাধ্যন্য। আজ সম্পূর্ণ উল্টো। গ্রাম থেকে আসা ছেলে মেয়েদের স্বল্প সংখ্যক ইঞ্জিনিয়ারিং, মেডিকেল বা বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির সুযোগ পেয়ে থাকে। প্রতিযোগিতামূলক চাকুরী বিসিএসের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। অথচ পূর্বে সিএসপি, ইপিসিএস বা বিসিএস ক্যাডারে গ্রাম থেকে আসা ছাত্রদের প্রাধান্য ছিল। আজ গ্রামে গ্রামে স্কুল কলেজ এমনকি উপজেলা পর্যায়ে অনার্স ও বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সুন্দর সুন্দর ভবন, বিজলি বাতি, পাখা ও আসবাবপত্রে ভরপুর। নেই ইল্লেখযোগ্য সংখ্যক ছাত্র-ছাত্রী এবং অভিজ্ঞতা সম্পন্ন দক্ষ শিক্ষক। বড় বড় দূরে থাক ছোট ছোট শহরের মোড়ে মোড়ে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইনবোর্ড ঝুলছে। ছোট ছোট অপরিসর দুই একটি কক্ষে খোলা হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়। চমৎকার সব নজরকাড়া ডিগ্রি বিক্রি হয় টাকার বিনিময়ে। পূর্বে সারা দেশ হতে বছরে দুই একজন কৃতি শিক্ষক অথবা গবেষক ডক্টরেট ডিগ্রি বা পিএইচডি অর্জন করতেন। এখন মুদি দোকানদারও তার নামের পূর্বে ডক্টরেট ডিগ্রি ব্যবহার করছেন। পূর্বে ডিগ্রি অর্জন বা পরীক্ষায় পাস করা বড়ই  কঠিন ছিল। পরীক্ষকরা ছিলেন বড়ই অনুদার। পাস নম্বরই যথেষ্ট মনে করতেন। এখন পরীক্ষা পদ্ধতিতে এসেছে ব্যপক পরিবর্তন। ইচ্ছে করলেই নম্বর কমিয়ে দিতে পারবেন না। কিভাবে নম্বর দিতে হবে তারও নির্দেশনা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা আছে।

পূর্বে আশি ভাগ নম্বর পেলে লেটার মার্কস, ৭৫ ভাগ পেলে স্টার মার্কস, ৬০ ভাগ হলে প্রথম বিভাগ, ৪৫ ভাগে দ্বিতীয় বিভাগ এবং ৩৩ ভাগ নম্বর পেলে তৃতীয় বিভাগে পাস ধরা হতো। এখন গ্রেডিং সিস্টেম ৮০-১০০ নম্বর পেলে এ প্লাস (জিপিএ-৫), ৭০-৭৯ নম্বর পর্যন্ত -এ (জিপিএ-৪), ৬০-৬৯ নম্বর পর্যন্ত এ-(জিপিএ ৩.৫), ৫০-৫৯ নম্বর পর্যন্ত  বি (জিপিএ-৩), ৪০-৪৯ নম্বর পর্যন্ত-সি (জিপিএ-২), ৩৩-৩৯ নম্বর পর্যন্ত-ডি(জিপিএ-১)।

 পৃর্বে সারা শিক্ষাবোর্ডে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণদের সংখ্যা ছিল খুবই নগন্য। নব্বইয়ের দশকে প্রশ্ন ব্যাংক এবং পঞ্চাশ ভাগ বৈর্ব্যত্তিক প্রশ্ন থাকায় লেটার, স্টার এবং প্রথম বিভাগে পাসের বহুগুন বেড়ে যায়। একবিংশ শতকের প্রথম প্রহরে নতুন গ্রেডিং সিস্টেমেও গোল্ডেন এ প্লাস এবং এ প্লাস প্রাপ্তদের সংখ্যা এত বেশী যে ভাল কলেজে বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তার ভর্তির সুযোগ পাচ্ছে না। গত শতাব্দির নব্বইয়ের দশক থেকে বাংলাদেশে শিক্ষার হার বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বেড়েছে বহুগুণ। বিভিন্ন ক্যাটাগরির, বিভিন্ন কারিক্যুলামের বিভিন্ন স্বাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। একই দেশে নানা পদ্ধতির শিক্ষা ব্যবস্থা বৈষম্যও বটে। এখন কিন্টারগার্ডেন একটি ফ্যাশান। গ্রাম হতে শুরু করে শহরের কোণায় কোণায় অলিতে গলিতে কিন্টারগার্ডেন এর জোয়ার বইছে। তার মধ্যে ইংলিশ মিডিয়ামগুলো দৃষ্টি কাড়ে বেশি। শিক্ষা খরচও ব্যাপক। ভাল মানের একটি ইংলিশ স্কুলের একজন ছাত্র-ছাত্রীর জন্য প্রতিমাসে কমপক্ষে ২৫-৩০ হাজার টাকা ব্যয় হয়। আর প্রতি বিষয়ে গৃহ শিক্ষক দিলে নিচের পক্ষে খরচ ৫০ হাজার টাকা। সে ক্ষেত্রে গ্রামের একটি প্রাইমারি বা বেসরকারী রেজিস্টার্ড স্কুলের একজন ছাত্রের পেছনে খরচ কয়টাকা?

আগে শিক্ষকগণ প্রাইভেট পড়ানোকে অমর্যদাকার মনে করতো। এখন সম্পূর্ণ উল্টো। গ্রাম বা শহরের যে কোন স্কুলের শিক্ষক বাড়িতে বা সরকারী কোয়ার্টারে ব্যাচের পর ব্যাচ ছাত্রদের প্রাইভেট পড়িয়ে থাকেন। একজন নামী দামী শিক্ষক নাকি প্রতিমাসে কয়েক ব্যাচে প্রাইভেট পড়িয়ে লক্ষাধিক টাকা আয় করে থাকেন। ইদানিং ছাত্র-ছাত্রীরাও টিউশনি ও কোচিং নির্ভর। এ কোচিং শিশু শ্রেণী হতে সর্বোচ্চ স্নাতকোত্তর  শ্রেণী পর্যন্ত বি¯তৃত। পূর্বে এইচএসসি লেভেল বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্ররা বড়জোর অংক বিষয়ে শিক্ষকের সাহায্য নিতো। এখন কলা বিভাগের এমনকি ইতিহাস বা বাংলা বিষয়ে ছাত্র-ছাত্রীরা স্নাতক সন্মান বা স্নাতকোত্তর পর্বেও প্রাইভেট পড়ে থাকে। পাসের হার ও গ্রেডেশনের উন্নতি হলেও জ্ঞানের পরিধি বেড়েছে বলে মনে হয়না। মেধাবী ছাত্ররা ক্যাডেট কলেজ, ভাল জিলা স্কুল বা নামী দামী ভাল প্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগ পেয়ে পড়তে চলে যায়। সাধারণ মানের স্কুল গুলোতে ভর্তি হয় আপেক্ষাকৃত কম মেধার ছাত্র-ছাত্রী। তাও পড়াশুনায় অমনোযাগী। শিক্ষকরাও যতœ সহকারে পড়াতে সচেষ্ট নন। সব মিলায়ে লেখাপড়া এখন কোচিং নির্ভর হয়ে গেছে। এক একটি কোচিং সেন্টারে স্কুল, কলেজ এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে ছাত্র-ছাত্রীর ভর্তির হার অনেক বেশি। বলা যায় কোচিং এর রমরমা ব্যবসা- যাকে বলে রেনেসাঁ। এ ব্যবসার হিস্যা নামী দামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক থেকে শুরু করে অনকে বড় বড় হোতাদের পকেটে পৌঁছে যায়। যে ছাত্রটি পরীক্ষায় পাস করতে পারেনি বা পরীক্ষা দিয়ে কোন চাকুরী পাইনি অথবা পাড়ার সেরা মাস্তান সে খুলে বসেছে রমরমা কোচিং সেন্টার। এখন তার নামের পেছনে ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার অথবা ডক্টরেট ডিগ্রি লিখিত হচ্ছে। প্রতি সেশনে কোটি কোটি টাকা করছে আয়। শিক্ষা এখন পুরাপুরি পণ্য সামগ্রী। যার যেমন টাকা, সামর্থ্য আছে তার চাহিদা অনুযায়ী চলছে সার্টিফিকেট অর্জন। কোচিং সেন্টার গুলোর সৌজন্যে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদেরও কল্যানে মেডিকেল, ইঞ্জিনিয়ারিং অথবা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রশ্ন ফাস হয়ে যাচ্ছে। ছাত্র শিক্ষকের সম্পর্ক নির্ণয়ের মানদন্ড অর্থ, প্রতিপত্তি আর ক্ষমতা। পণ্য বাজারে শিক্ষাই আজ অন্যতম পণ্য।

শিক্ষা ব্যবস্থাকে প্রতিযোগিতামূলক কল্যাণকর ও সকলের জন্য একই ধরণের শিক্ষার বিস্তারকল্পে শিক্ষাখাতের দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনাকে দূরীকরণার্থে বিভিন্ন মেয়াদে পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন। যে কোন মূল্য শিক্ষা ক্ষেত্রের সকল অপচয় দুর্নীতি ও দূবৃত্তায়ণ দূর করার জন্য সকলকে এগিয়ে আসতে হবে এবং সোচ্চার হতে হবে।

এস এম রইজ উদ্দিন আহম্মেদ

সাবেক - পরিচালক, স্থানীয় সরকার,খুলনা বিভাগ, খুলনা ।

(কবি, গবেষক এবং আঞ্চলিক ইতিহাস লেখক।)


Post a Comment

0 Comments