সর্বশেষ

6/recent/ticker-posts

Header Ads Widget

সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ২০টি বাংলা গান ।

 

সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ২০টি বাংলা গান ।

- এটিএম মনিরুজ্জামান

বিবিসি বেশ কয়েক বছর আগে পহেলা বৈশাখে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাংলা গানের জরিপের ফলাফল প্রকাশ করে । ধারাবাহিকভাবে জরিপের ভিত্তিতে শীর্ষ ২০টি গান দর্শক জরিপে শ্রেষ্ঠত্ব পায় । এর মধ্যে  শীর্ষ সঙ্গীত হিসেবে শ্রোতাদের রায়ে বিবেচিত হয় বাঙালীর হৃদয় জয় করা সঙ্গীত- ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি ।’
বিবিসির সঙ্গীত বিষয়ক এ জরিপের প্রতিক্রিয়ায় বেশি স্থান পায় মুক্তিযুদ্ধকালীন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে সম্প্রচারিত বাঙালির সাহস জোগানো বেশ কয়েকটি গান ।
বিবিসির সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাংলা গান নির্বাচনে শ্রোতাদের গানের তালিকার ২য় স্থান পায়  “মানুষ মানুষের জন্য” ।

বিবিসির দর্শক জরিপে শীর্ষ ২০টি গান ।

১ম  স্থানে-  “সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি ।”
২য় স্থানে-  “মানুষ মানুষের জন্য”
৩য় স্থানে-  “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো”
৪র্থ  স্থানে- “কফি হাউসের সেই আড্ডাটা ।”
৫ম  স্থান - “এক সাগর রক্তের বিনিময়ে”
৬ষ্ঠ  স্থান-  “আমি বাংলার গান গাই, ”
৭ম  স্থান-  “মোরা একটি ফুলকে বাঁচাব বলে, ”
৮ম  স্থান-  “তুমি আজ কত দূরে,”
৯ম  স্থান-  “এক নদী রক্ত পেরিয়ে, ”
১০ম স্থান-  “ধনধান্য পুস্প ভরা আমাদের এই বসুন্ধরা “
১১তম স্থান- “মুছে যাওয়া দিনগুলি আমায় যে পিছু ডাকে,”
১২তম স্থান- “ সালাম সালাম হাজার সালাম, “
১৩তম স্থান- “ জয় বাংলা বাংলার জয়,”
১৪ তম স্থান- “ খাঁচার ভেতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়, ”
১৫তম স্থান- “ একবার যেতে দে মা আমার ছোট্ট সোনার গাঁয়,”
১৬তম স্থান- “কারার ঐ লৌহকপাট,”
১৭তম স্থান- “ এই পদ্মা এই মেঘনা এই যমুনা সুরমা নদীতটে,”
১৮তম স্থান-  ‘চল চল চল, উর্ধ্বগগনে,”
১৯তম স্থান-  “একতারা তুই দেশের কথা বলরে এবার বল, ”
২০ তম স্থান-  “ তুমি কি দেখেছ কভু জীবনের পরাজয়.”

আমার সোনার বাংলা’  সর্বশ্রেষ্ঠ বাংলা গান :

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি’ চিরদিন তোমার আকাশ তোমার বাতাস আমার প্রাণে.... বিবিসি শ্রোতা জরিপে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ গান নির্বাচিত হয়েছে । গানটি আমাদের রক্তের সঙ্গে মিশে গেছে । বাংলার প্রকৃতির রূপ সুন্দরভাবে কবিগুরু গানটিতে ফুটিয়ে তুলেছেন । গানটি আমাদের কথা বলে, এ জন্যই গানটি সর্বশ্রেষ্ঠ হয়েছে , গানটি দেশ, ভাষা ও সংস্কৃতিপ্রীতির প্রতীক । এ কালজয়ী গানটি যুগে যুগে বাঙালিকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করে ।
আমার সোনার বাংলা গানটি আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় সঙ্গীত করা হয় ১৯৭২ সালে । এ বছরই এটা সংবিধানে জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে স্থান পায় ।

২য় স্থানে- ভূপেন হাজারিকার “মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য ” :

অনন্য শিল্পী ভূপেন হাজারিকার গাওয়া মানবতাবাদী গান ‘মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য, একটু সহানুভূতি কি মানুষ পেতে পারে না..... বিবিসি শ্রোতা জরিপে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ২০ টি বাংলা গানের তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে চলে এসেছে । গানটিতে মানুষের স্বভাবগত বৈশিষ্ট্য বিশেষভাবে প্রতিভাত হয়েছে । মানুষের মধ্যে যেমন দানবীয় শক্তি বিদ্যমান, তেমনি আবার মানবিক গুনাবলীও বিশেষভাবে লক্ষনীয় । আসামের তেজপুরে ষাটের দশকে এ গানটির জন্ম । বাংলা ভাষায় গানটি নতুন করে প্রাণ পায় ১৯৭৮ সালে । গৌহাটির হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় গানটি সম্পর্কে শিল্পী ভূপেন হাজারিকা বিবিসিকে বলেন, ১৯৬০ সালের শেষের দিকে গানটি তৈরি হয় । আসাম ও নাগাল্যান্ডে তখন কাটাকাটি মারামারি চলছে । সবদিকে কারফিউ আর কারফিউ । ঠিক সে সময় তাদের মারামারি বন্ধের আহ্বান জানিয়ে আসাম নাগাল্যান্ডের ভাষায় গানটি গাওয়া হয় । পরে বাংলা করা হয় ।

৩য় স্থানে- “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারী :

তৃতীয় স্থানে এসেছে মহান ভাষা আন্দোলনের অমর শহীদদের নিয়ে রচিত ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারী, আমি কি ভূলিতে পারি... গানটি। কালজয়ী এ গানটি রচনা করেছেন প্রখ্যাত সাংবাদিক সাহিত্যিক আবদুল গাফ্ফার চৌধূরী । মহান ভাষা আন্দোলন এবং ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগের কথা আবেগ দিয়ে অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী করে তুলে ধরতে সক্ষম হওয়ায় গানটি সর্বসেরা ৩ নম্বরে বাংলা গানের তালিকায় চলে এসেছে । গানটিতে প্রথমে সুরারোপ করেন, লিল্পী আবদুল লতিফ । তখন এটি ছিল একক কন্ঠে গাওয়ার উপযোগী গান । পরে আলতাফ মাহমুদের সম্মিলিত কন্ঠে গাওয়ার উপযোগী করার জন্য সুরারোপ করেন । এ সময় থেকেই এটি প্রভাতফেরির গান হয়ে উঠে । আলতাফ মাহমুদ এমন সুরারোপ করেন, যা মানুষ খালি পায়ে ধীরে পদক্ষেপে হেঁটে শান্ত কণ্ঠে গেঁয়ে থাকে ।
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারী গানটি তাৎক্ষণিকভাবে রচনা করেন আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী । ১৯৫২ সালের ডিসেম্বরে গেণ্ডারিয়ার ধুপখোলায় গোপনে কিছু লিফলেট বিতরণ করা হয় । সেখানে ছাপার অক্ষরে এ গানটি প্রথম দেখা যায় । ১৯৫৩ সালের ঢাকা কলেজের এক অণুষ্ঠানে গানটি প্রথম গাওয়া হয়। নিজের সুরে তখন গানটি গান শিল্পী আবদুল লতিফ । পরে আলতাফ মাহমুদ প্রভাতফেরির উপযোগী করে এতে সুর দেন ।  গেণ্ডারিয়া অঞ্চলের কিছু ছেলেমেয়েকে নিয়ে তিনি শহীদ মিনারে যান এবং সমবেত বণ্ঠে নিজের সুরে গানটি পরিবেশন করেন । তখন থেকে আলতাফ মাহমুদের সুরেই গানটি গাওয়া হচ্ছে ।

গানটি রচনার প্রেক্ষাপট বলতে গিয়ে আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী বলেন, ২১ ফেব্রুয়ারী তিনি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রফিকের মৃতদেহ দেখতে পান । রক্তাক্ত নিথর একটি দেহ। এই মর্মান্তিক দৃশ্যই তাকে এ গানটি লিখতে প্রেরণা জোগায় । রফিকের লাশ দেখে তার মনে হচ্ছিল, এই তরুণতো আমিও হতে পারতাম । কিংবা আমার ভাইও হতে পারতো । ভাষার জন্য আমার ভাইয়ের রক্তে রঞ্জিত হল এই সিটি ? ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে সাইকেলে ঢাকা কলেজ হোস্টেলে ফিরতে ফিরতে এই অণুভূতি তাকে সারাক্ষণ তাড়িত করছিল । সেই তাড়না থেকেই তিনি লিখে ফেলেন ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারী, আমি কি ভুলিতে পারি ’।  তিনি বলেন, গানটি বড়। তবে প্রথম অংশটুকু সাধারণত গাওয়া হয় ।

৪র্থ স্থানে- ‘কফি হাউসের সেই আড্ডা আজ আর নেই’

আজ আর নেই কোথায় হারিয়ে গেল সোনালী বিকেলগুলো সেই আজ আর নেই..
মান্না দে’র গাওয়া এই গানটি বিবিসির শ্রোতা জরিপে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ২০টি বাংলা গানের তালিকায় চতুর্থ স্থান অধিকার করেছে । গানটির কথা, সুর জীবন স্মৃতির সঙ্গে একাত্ম হয়ে যাওয়া এবং মনকে অতীতে ফিরিয়ে নেয়ায় এটি সেরা বাংলা গানের তালিকায় চলে আসে । ফেলে আসা দিনের স্মৃতি রোমন্থনের নষ্টালজিক এ গানটির সুরকার শিল্পী নিজেই । এর গীতিকার গৌরিপ্রসন্ন মজুমদার। গতানুগতিক জীবনধারার একটা বিশেষ সময়ের বা বিশেষ ক্ষণের প্রতিচ্ছবি চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তোলা এ গানটি মান্নাদে গান ১৯৮৩ সালে । গানটি সম্পর্কে তিনি বলেন, গৌরি গানটি লিখে পড়ে শোনানোর পর আমি অবাক হয়ে যাই । গানটি গাওয়ার সময় নিখিলেশ প্যারিসে, মইদুল ঢাকাতে, তারা কেউ নেই কবরে, গ্রান্ডের গিটারিস্ট গোয়ানিস ডিসিসা এই চরিত্রগুলো চোখের সামনে ভেসে ওঠে। গানটি গাওয়ার অনুভূতি সম্পর্কে তিনি বলেন, আমি, গৌরি, সুকর্ণকান্তি গানটিকে কি সুর দেয়া যায় সে সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করি । এরপর এটি তুলি। গানটি গাওয়ার সময় একটি বন্ধু দলের সামগ্রিক চিত্র চোখের সামনে ভেসে ওঠে। বিখ্যাত সুরকার নচিকেতা ঘোষের পুত্র সুকর্ণকান্তি ঘোষ পিতৃতুল্য গীতিকার গৌরিপ্রসন্ন মজুমদার সম্পর্কে বলেন, বাবা মারা যাওয়ার পর গৌরি দা’র সঙ্গে আমার ছিল বন্ধুর মতো সম্পর্ক । আমি তাকে ‘আড্ডা' নিয়ে একটি গান লিখতে বললে তিনি সঙ্গে সঙ্গে এই গানটি লিখে ফেলেন। আড্ডার প্রতিটি চরিত্রই আমাদের চিরচেনা, অতি পরিচিত মুখ যেন ।

৫ম স্থানে-‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে...‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বাংলার স্বাধীনতা আনলে যারা আমরা তোমাদের ভূলব না..

গোবিন্দ হালদার রচিত এ গানটি বিবিসির শ্রোতা জরিপে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ২০টি বাংলা গানের তালিকায় পঞ্চম স্থান অধিকার করেছে । মহান মুক্তিযুদ্ধে জীবন উৎসর্গকারী শহীদদের ত্যাগের কথা অসাধারণভাবে এ গানটিতে ফুটে ওঠায় এটি সেরা বাংলা গানের তালিকায় চলে আসে । স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের জন্য প্রথমে এ গানটিতে কন্ঠ দেন শিল্পী স্বপ্না রায় । পরে ১৯৭৩ সালে শিল্পী রেবেকা সুলতানা দ্বিতীয়বার গানটি গান । এটির সুরকার আপেল মাহমুদ ।  চিত্রপরিচালক চাষী নজরুল ইসলাম ‘৭২ সালে নির্মিত ‘ওরা ১১ জন ছবির শেষাংশে আবহ সঙ্গীত হিসেবে গানটি ব্যবহার করেন ।
গানটি সম্পর্কে পশ্চিমবঙ্গের গীতিকার গোবিন্দ হালদার বলেন, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় অনেক গান লিখেছিলাম । এটি ছিল তার অন্যতম। কারণ সে সময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে ভাল গানের খুব অভাব ছিল ।
সুরকার আপেল মাহমুদ বলেন, গানটিতে সুর করতে গিয়ে তিনি গীতিকারের সঙ্গে একাকার হয়ে গিয়েছিলেন । চাষী নজরুল ইসলাম বলেন, ‘ওরা ১১জন’ ছবির পুরো থিমটি ছিল এ গানের মধ্যে । তাই আমি গানটি ব্যবহার করি ।
গানটির শিল্পী রেবেকা সুলতানা বলেন, স্বপ্না রায়ের গাওয়া গানটি আমরা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে শুনেছি। প্রথমে উনি গানটি গান । সে গানটি যখন আমাকে আপেল ভাই গাইতে অনুরোধ করেন তখন আমার খুব ভাল লেগেছিল । এরকম একটি ঐতিহাসিক গান নতুন করে গাইতে পেরে নিজেকে ভীষণ ভাগ্যবান মনে করেছি । স্বপ্না রায়ের গানটি আবার গাওয়াটা একটা চ্যালেঞ্জ মনে হয়েছিল আমার কাছে । কারণ তিনি খুব ভালভাবে গানটি গেয়েছিলেন । আমি তার মতো করে গাইতেই চেষ্টা করেছি ।

৬ষ্ঠ স্থানে-‘আমি বাংলার গান গাই’

সংগীতের স্রষ্টা প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের লেখা, সুরকরা ও গাওয়া ‘আমি বাংলার গান গাই/আমি বাংলার গান গাই/আমি আমার আমিকে চিরদিন এই বাংলায় খুঁজে পাই’ গানটি বিবিসির শ্রোতা জরিপে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাংলা গানের তালিকায় ষষ্ঠ স্থান লাভ করেছে । মূল গানের কথা ও সুর প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের ।  গানটির ভাব, ভাষা ও সুর অপূর্ব হওয়ায় এই গানটি শ্রেষ্ঠ তালিকায় উঠে এসেছে । মূল গানের কথা ও সুর প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের হলেও মাহমুদুজ্জামান বাবুর ভরাট কন্ঠে গানটি বাংলাদেশে জনপ্রিয়তা লাভ করে । গানটিতে খুবই আবেগঘন সুরারোপ করা হয়েছে । এতে বাঙালি জাতিসত্তার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে । বাংলার রূপ পুরোপুরিভাবে খুঁজে পাওয়া যায় এ গানের মাঝে । বাঙালির চিন্তা, চেতনা, আবেগ, অনুভূতি সবকিছুর সঙ্গে বাংলার সম্পর্ক কতটুকু নিবিড় তা এ গানটিতে প্রকাশ পেয়েছে । আমাদের প্রতিদিনের বলা শব্দগুলোই ব্যবহৃত হয়েছে গানটিতে । আমাদের হৃদয়ের প্রাণের কথা সবই ফুটে উঠেছে এ গানে । শিল্পী মাহমুদুজ্জমান বাবুর কন্ঠে ১৯৯৩ সাল থেকে গানটি অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠে । গানটি সম্পর্কে মাহমুদুজ্জামান বাবু মতে, প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের লেখা ও সুরকরা এ গানটি অসাধারণ মনে হয় । কখনও কখনও মনে হয় গানটির ভেতরে ভীষণ সমর্পণ আছে । রয়েছে এক ধরনের আত্মনিবেদনের ভঙ্গিমা । আবার কখনও কখনও মনে হয়, বাংলার যে আবহমানকালের এক ধরনের নৈসগকি রূপ, সে রূপটা রয়েছে এ গানটিতে ।  তিনি এখনও মনে করেন এ গানটির জন্য মানুষের মনে যতুটুকু আবেগ তৈরি হয়েছে, দেশকে ঘিরে, জীবনকে ঘিরে পারিপার্শ্বিকতাকে ঘিরে যতখানি মমতা তৈরি হয়েছে ।, তার সবটুকু কৃতিত্ব প্রতুল মুখোপাধ্যায়েরইে প্রাপ্য । কারণ গানটি প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের লেখা ও সুরকরা এবং তারও গাওয়া । তিনি বলেন, আমি মাত্র একজন বার্তাবাহকের ভূমিকা পালন করেছি । এর বাইরে আমার কোন কৃতিত্ব নেই । গানটিতে যে কথাগুলো আছে আমি আসলে তা বিশ্বাস করে গেয়েছি। আমি প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের অনুগামী হিসেবে গানটিতে কন্ঠ দিয়েছি ।
গানটির গীতিকার ও সুরকার প্রতুল মুখোপাধ্যায় বলেন, এ গান তাকে অনেক কিছু দিয়েছে । এটি এমন একটি গান যা থেকে প্রজন্মান্তরে পৌছে যাচ্ছে । তিনি বলেন, তিনি মনে করেন তার লেখা এ গানটি খুবই রুচিসম্মত। এর মধ্যে বলার মতো কিছু কথা আছে । এতে বাংলা ভাষার সত্তা, বাংলা ভাষার অধিকারের কথা রয়েছে। এর মধ্যে কোন সংকীর্ণতা নেই । তিনি বলেন, গান খুবই শক্তিশালী মাধ্যম । অন্তরকে বদলে দেয়ার ক্ষমতা গানের আছে। প্রতুল মুখোপাধ্যায় বলেন, কোন মহান সৃষ্টির কোন সত্তা থাকে না, তখন সেটা সবার হয়ে যায়। তিনি বলেন, ‘আমি বাংলায় গান গাই’ গানটি প্রতুল মুখোপাধ্যায় লিখেছেন বললে পুরোপুরি ঠিক বলা হবে না, বরং এটা একজন বাঙালি সত্তা লিখেছে বললেই ঠিক হবে । এমন হতে পারে যে একশ’ বছর পরে আমার নামটা থাকবে না, হয়তো মুছেই যাবে, কিন্তু গানটি থেকে যাবে ।

৭ম স্থানে -মোরা একটি ফুলকে বাঁচাব বলে যুদ্ধ করি..

আপেল মাহমুদের গাওয়া ‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাব বলে যুদ্ধ করি..’ গানটি বিবিসির শ্রোতা জরিপে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ২০টি বাংলা গানের তালিকায় সপ্তম স্থান অধিকার করেছে । গানটিতে দেশের প্রতি, দেশের মানুষের প্রতি গভীর ভালবাসা ফুটে উঠেছে । তাছাড়া গানটি মানুষের হৃদয়কে প্রচন্ডভাবে আলোড়িত করে, মানুষকে দেশাত্মবোধে আন্দোলিত করে । এ কারণেই এটি সেরা বাংলা গানের তালিকায় চলে আসে। গানটির গীতিকার গোবিন্দ হালদার। সুরকার শিল্পী নিজেই ।
স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অন্যতম সংগঠক আশফাকুর রহমান গানটি সম্পর্কে বলেন, গোবিন্দ হালদার স্বাধীন বাংলা বেতারের জন্য দুটি খাতায় গান লিখেছিলেন সাংবাদিক কামাল আহমেদের মাধ্যমে ।
আপেল মাহমুদ গানটি সম্পর্কে বলেন, কলকাতার বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দের দফতরে জুনের শেষের দিকে গানটির সুর করা হয় । রাত ১২ টার দিকে সুর শেষ করে তিনি মান্না হককে ঘুম থেকে ওঠান । মান্না হক তবলা বাজান । তিনি হারমোনিয়াম বাজিয়ে গানটি গান । তখনই এটি রকর্ড করা হয় । স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে রোজই গানটি বাজানো হতো । আপেল মাহমুদ গানটি সম্পর্কে আরও বলেন, দেশ, দেশের স্বাধীনতা এমনকি সমগ্র বিশ্বই একটি ফুল হতে পারে । এই দেশ, স্বাধীনতা বা বিশ্বকে বাঁচাতে সবাই লড়াকু হতে পারে।তবেই সবকিছু সুন্দর হবে, হবে আসলেই ফুলের মতো ।
স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অন্যতম কর্মী আশফাকুর রহমান খান জানান, পশ্চিমবঙ্গের গীতিকার গোবিন্দ হালদারের স্বতঃফুর্ত উপহার ছিল এ গানটি। তিনি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের জন্য অনেকগুলো গান করেছেন । দুটি খাতায় এসব গান লেখেন । দুই খাতায় ৫০ থেকে ৬০টি গান ছিল ।
এর মধ্যে অল্প গান সুর দিয়ে গাওয়া হয়েছিল। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের নিজস্ব গানের মধ্যে এটি ছিল অন্যতম সেরা গান । সুর ও কথা মিলিয়ে গানটি ছিল হৃদয়গ্রাহী ।

৮ম স্থানে- জগন্ময় মিত্রের ‘তুমি আজ কত দূরে..

‘বলেছিলে তাই চিঠি লিখে যাই কথা আর সুরে, সুরে মন বলে তুমি রয়েছ যে কাছে আঁখি বলে কত দূরে, তুমি আজ কত দূরে..জগন্ময় মিত্রের গাওয়া এ গানটি বিবিসির শ্রোতা-জরিপে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ২০টি বাংলা গানের তালিকায় অষ্টম স্থান অধিকার করেছে । বিরহ বেদনা-কাতর কন্ঠে গাওয়া এ গানটি শোনার আবেদন সহজে শেষ না হওয়ায় এবং প্রিয়তমার জন্য মনে মনে অন্যরকম এক শিহরণ জাগানোর কারণে এটি সেরা বাংলা গানের তালিকায় চলে এলো ।
চিরন্তন আবেদনের এ গানটি প্রথম গাওয়া হয় ১৯৪৬ সালে । ‘চিঠি’ নামের এই গানটি গীতিকার প্রনব রায় আর সুরকার সুবল দাস ।
শিল্পী জগন্ময় মিত্র একবার বিবিসিকে দেয়া সাক্ষাৎকারে এ গানটি প্রসঙ্গে বলেছিলেন, গানটি ছিল অত্যন্ত আবেগপ্রবণ । গানটির স্থায়ী অন্তরা, সুর সর্বোপরি সাফল্য নিয়ে গীতিকার ও সুরকার দু’জনই সংশয়ে ছিলেন। কিন্তু গানটি গাওয়ার পর দেখা গেল মানুষ লুফে নিয়েছে। এই গান গাওয়ার পর জগন্ময় মিত্রের নাম চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল । ‘গানটির ভেতরে এতটা আবেদন রয়েছে, গাওয়ার সময় টের পাইনি’-বলেন জগন্ময় মিত্র ।
শিল্পী জগন্ময় মিত্রের খ্যাতির বিড়ম্বনা প্রসঙ্গে প্রবীণ শিল্পী, সুরকার এবং বাংলা গানের গবেষক বিমান মুখোপাধ্যায় জানান, গানটি বের হওয়ার পর বাজারে রটে গেল-জগন্ময়ের স্ত্রী মারা গেছেন । সেই দুঃখে তিনি এ গানটি গেয়েছেন । লোকে এটাও বিশ্বাস করেছিল । অনেকে বলতে লাগল-স্ত্রী মারা না গেলে আবেগ দিয়ে এত ভাল গান তিনি গাইতে পারতেন না । এত বিরহ-ব্যথিত কন্ঠেই এই গান শোভা পায় । গানে বিরহ থাকার ব্যাপারে জগন্ময় মিত্র বিবিসিকে দেয়া সেই সাক্ষাৎকারে আরও বলেছিলেন-‘মনের একেক অবস্থায় একেক গান তৈরি হয়। ‘বিরহ-কাতর’ বানিয়ে ফেলেছিলেন ।

 

৯ম স্থান- ‘এক নদী রক্ত পেরিয়ে বাংলার আকাশে রক্তিম সূর্য আনলে যারা...

বিবিসির শ্রোতা জরিপে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ২০টি বাংলা গানের তালিকায় নবম স্থান পেয়েছে‘এক নদী রক্ত পেরিয়ে বাংলার আকাশে রক্তিম সূর্য আনলে যারা..’ গানটি বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে বীর মুক্তিযোদ্ধাদেও অবদান স্মরণ করায় গানটি সেরা বাংলা গানের তালিকায় চলে আসে । এটি গেয়েছেন শাহনাজ রহমতুল্লাহ ।  গানটির গীতিকার ও সুরকার প্রখ্যাত চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব খান আতাউর রহমান । স্বাধীনতা যুদ্ধেও পরবর্তী সময়ের পেক্ষাপট নিয়ে ১৯৭৩ সালে নির্মিত তার ‘আবার তোরা মানুষ হ’ ছবির জন্য তিনি গানটি রচনা করেন । গানটি সম্পর্কে শিল্পী শাহনাজ রহমতুল্লাহ বলেন, তিনি গানটি গেয়েছেন মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ।
স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অন্যতম সংগঠক আশফাকুর রহমান খান গানটির পেক্ষাপট ও খান আতাউর রহমান সম্পর্কে বলেন, তিনি সময়কে ধরতে চেয়েছেন তার চলচ্চিত্রের মাধ্যমে । সেই চলচ্চিত্রেরই গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে গানটি রচনা করেন তিনি । গানটি শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের পাশাপাশি তাদের বিজয়গাথা ও গৌরবগাথাও তুলে ধরা হয়েছে । পুরো বাঙালি সমাজ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম শহীদদের প্রতি ও মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে ঋনী থাকার বিষয়টিও তিনি তুলে ধরেছেন । চলচ্চিত্রের গান হিসেবে ও এ গানের মূল্য সব সময় থাকবে ।
সুরকার আলাউদ্দিন গানটি সম্পর্কে বলেন, বাংলাদেশ যতদিন থাকবে এ গানটি ততদিনই বেঁচে থাকবে ।

১০ স্থানে- ‘ধন ধান্য পুষ্প ভরা আমাদের এই বসুন্ধরা..

দীজেন্দ্র লাল রায়ের (ডিএলরায়) ‘ধন ধান্য পুষ্প ভরা আমাদের এই বসুন্ধরা...’ গানটি বিবিসির শ্রোতা জরিপে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাংলা গানের তালিকায় দশম স্থানে চলে এসেছে । গানের প্রতিটি শব্দে বাংলার রুপ-প্রকৃতির অনন্য বৈশিষ্ট্য ফুটে ওটায় এটি সেরা বাংলা গানের তালিকায় স্থান পেল ।
১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের পর গড়ে ওঠা স্বদেশী আন্দোলনের সময় গানটি রচনা করেন দীজেন্দ্র লাল রায় । ১৯০৯ সালে প্রকাশিত তার সঙ্গীত গবেষক ড. করুণাময় গোস্বামী বলেন, ডিএল রায়ের দেশপ্রেম, দেশ গৌরববোধ প্রবলভাবে ফুটে উঠেছে এ গানে । এটি বঙ্গভঙ্গ সময়ের রচনা। ব্রিটিশ সরকারের অধীনে চাকরি করেও ডিএল রায় বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনে রাজপথে নামেন । ডিলএল রায় বিলেতে শিক্ষা নিয়েছিলেন । পাশ্চাত্য চলনটা আছে । তার আগে এ ধারার বাংলা ছিল না । গানটি আমাদের স্মৃতির মধ্যে ছিল, অভ্যাসের মধ্যে ছিল ‘৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের মধ্যে যে কয়টি গান গাওয়া হতো তার মধ্যে এটি ছিল অবধারিত ।

১১তম স্থানে - ‘মুছে যাওয়া দিনগুলি আমায় যে পিছু ডাকে,

বিবিসি’র শ্রোতা জরিপে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সেরা ২০টি বাংলা গানের তালিকায় ১১ তম স্থান পেয়েছে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া ‘মুছে যাওয়া দিনগুলি আমায় যে পিছু ডাকে, স্মৃতি যেন আমার এ হৃদয়ে বেদনার রঙে রঙে ছবি আঁকে..’ গানটি । গানটির কথা, সুরে স্মৃতিময় অতীত দিনের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় । তাই এটি চলে এসেছে সেরা গানের তালিকায় । এই কালজয়ী গানে ১৯৫৮ সালে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় কন্ঠ দেন লুকোচুরি ছবির জন্য । গানটির গীতিকার ছিলেন গৌরী প্রসন্ন মজুমদার । গানটি সম্পর্কে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের স্ত্রী বেলা মুখোপাধ্যায় বলেছেন, লুকোচুরি ছবিটি ছিল কিশোর কুমারের। তার সঙ্গে হেমন্তের অসম্ভব ভাব ছিল । তাদের মুম্বাইয়ের বাড়িতে বসেই গানটি তৈরি করা হয় । কিশোর কুমারের ভীষণ ভাল লেগেছিল গানটি। হেমন্তেরও প্রিয় গানের একটি এটি। গীতিকার গৌরী সম্পর্কে তিনি বলেন, তার লেখা অসম্ভব ভাল লাগত তার। চলচ্চিত্র পরিচালক অরবিন্দু মুখোপাধ্যায় স্মৃতিকাতর তথা আমাদের পুরনো দিনের স্মৃতির কাছে নিয়ে যায় । গৌরী দা গান লিখে দিলেই হেমন্ত বাবু তৎক্ষণাৎ তাতে সুর করে ফেলতেন । তিনি খুব সাদামাটা সুর প্রয়োগ করলেও তার আবেদনটা ছিল সর্বজনগ্রাহ্য । সুরেলা সুরকে তিনি বেশি পছন্দ করতেন । প্রবীণ সুরকার, গীতিকার এবং শিল্পী অভিজিত বন্দ্যোপাধ্যায় হেমন্তের গানের সুর ও কথা সম্পর্কে বলেন, তিনি সব সময় পরিবেশ পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে গান করতেন । এ জন্য তিনি সঙ্গীত জগতের মুকুটহীন সম্রাট ।

১২তম স্থানে- ‘সালাম সালাম হাজার সালাম

‘সালাম সালাম হাজার সালাম সকল শহীদ স্মরণে আমার হৃদয় রেখে যেতে চাই তাদের স্মৃতির চরণে.. দরদি শিল্পী আবদুল জব্বারের গাওয়া এ গানটি দ্বাদশ স্থান দখল করেছে বিবিসি শ্রোতা জরিপে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাংলা গানের তালিকায় । স্বাধীনতা যুদ্ধে নিহত লাখ লাখ শহীদের স্মৃতি গানটির মাধ্যমে ফুটে ওঠায় এটি শ্রেষ্ঠ বাংলা গানের তালিকায় উঠে আসে । গানটির শিল্পী এবং সুরকার আবদুল জব্বার গানটি সম্পর্কে বলেন, স্বাধীনতা যুদ্ধের পর দেশে এসে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন তার এ গান মুক্তিযোদ্ধাসহ পুরো বাঙালিকে কতটা অনুপ্রাণিত করেছিল । একটি গান দিয়ে সমগ্র দেশবাসীকে জানানো যায় এ গানটির মাধ্যমেই তিনি তা বুঝতে পেরেছিলেন ।

১৩ তম স্থানে -‘জয় বাংলা বাংলার জয়’

‘জয় বাংলা বাংলার জয়, হবে হবে হবে হবে নিশ্চয় কোটি প্রাণ এক সাথে মিলেছে অহৃরাতে, নতুন সূর্য ওঠায় এই তো সময়’- জনতার জয়গানের কালজয়ী এই দেশাত্মবোধক গানটি বিবিসি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাংলা গানের শ্রোতা জরিপে ১৩তম স্থান লাভ করেছে । মুক্তিযুদ্ধকালীন স্বাধীনতাকামী মানুষকে উজ্জীবিত করা ও মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রেরণাদানকারী ওই গানটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে । আর এ কারণেই গানটি সেরা গানের তালিকায় উঠে আসে । ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান ও এর পরই তদানীন্তন পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনে বাঙালিদের বিপুল বিজয়ে উজ্জীবিত গীতিকার গাজী মাজহারুল আনোয়ার রচনা করেন এই কালজয়ী গান জয় বাংলা বাংলার জয় । গাজী মাজহারুল আনোয়ার বলেন, এই গানটি লেখার পর তিনি নিজে নিজে গুন গুন করে এই সুরটিই করেছিলেন এবং বন্ধু আনোয়ার পারভেজ গানটি শুনেই হঠাৎ করে লাফিয়ে উঠে বললেন, গানটি ভালই লাগছে, দাঁড়া আমি একটু মডিফাই করে নেই । সে তখন হারমনিয়ামে কিছুটা মডিফাই করে । সঙ্গে সঙ্গে গানটি সুরকার আলতাফ মাহমুদের কাছে নিয়ে গেলে তিনি বলেন, বাহ্ ভাল লাগছে তো, ভাল লাগছে । এটা হারিয়ে যাওয়ার কোন সুযোগ নেই । ডাক সব শিল্পীকে। তাৎক্ষণিকভাবে সব শিল্পীকে ডাকা হয় এবং সে মুর্হূতে গানটি সৃষ্টি হয়ে যায় । তিনি বলেন, আমাদের কি কি সমস্যার কারণে এই স্বাধীনতা অনিবার্য হয়ে উঠেছিল এবং সেগুলোকে আমরা কিবাবে জয় করতে পারব, পুরো গানটিতেই আমাদের চাহিদাটা ও আমাদের দাবিটা ছিল । গানটির সুরের মধ্যে রয়েছে স্বাধীনতা পাওয়ার জন্য এক উন্মাদনা । গানটির সূরকার আনোয়ার পারভেজ বলেন, স্বাধীনতা চাই, বাংলাদেশ চাই, তখন একটা স্লোগান ছিল জয়বাংলা, এই স্পিরিট নিয়েই গানটিতে সুরারোপ করা হয়। একজন যোদ্ধার আস্থা ও আশাবাদ নিয়েই মূলত গানটিতে সুর দেয়া হয়েছিল । তিনি বলেন, এটি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে সূচনা ও সমাপ্তি সঙ্গীত হিসেবে ব্যবহার করা হতো । মুক্তিযুদ্ধের এক বিশাল প্রেরণা ছিল এ গানটি । তিনি বলেন, প্রতিটি গান একটি সন্তানের মতো । কিন্তু আমার এ ভাল সন্তানটিকে কেউ মূল্যায়ন করল না । স্বাধীনতা যুদ্ধকালে ওই গানটিই হয়ে উঠেছিল বাঙালির সাহস আর উদ্দীপনার প্রধান অবলম্বন-সে কথাই বললেন, স্বাধীনতা বাংলা বেতার কেন্দ্রের আলী যাকের । তিনি বলেন, তখন হঠাৎ কর্ইে স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র থেকে এ গানটি বাজানো হয় । আমিও হঠাৎ কর্ইে আমার ট্রানজিস্টারের নব ঘুরাতে ঘুরাতে ওই ষ্টেশনটি পেয়ে যাই এবং আমি একেবারে রোমাঞ্চিত হয়ে যাই । তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ওই গানটি শুধু স্বাধীন বাংলা বেতার্ইে প্রচারিত হতো না, প্রতিটি মুক্তিযোদ্ধার মুখে মুখে ফিরত গানটি । স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রেও সূচনা সঙ্গীত হিসেবে এ গানটি বাজানো হতো । মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিটি ড্রিলের সঙ্গে, রণসঙ্গীত হিসেবে, বিদায়ী সঙ্গীত হিসেবে গানটি বাজানো হতো ।

 

১৪তম স্থানে-ফরিদা পারভীনের ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি’

‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়, আমি ধরতে পারলে মনবেড়ি দিতাম পাখির পায়..’ গানটি বিবিসির শ্রোতা জরিপে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাংলা গানের তালিকায় ১৪তম স্থান দখল করেছে । নশ্বর মানব জীবনের চিরন্তন দর্শন গানটিতে অস্বাভাবিক সুন্দরভাবে ফুটে ওঠায় এটি সেরা গানের তালিকায় চলে এসেছে । গানটি গেয়েছেন মরমী শিল্পী ফরিদা পারভীন । ১৯৭৩ সালে ঢাকা বেতারের ট্রান্সক্রিপশন সার্ভিস চালু হওয়ার সময় তিনি এটি প্রথম গান। গানটির রচয়িতা বাংলা সঙ্গীত জগতের কিংবদন্তি ফকির লালন শাহ । তার শিষ্যদের মতে, কয়েক হাজার গান রয়েছে লালন ফকিরের।  এর মধ্যে মাত্র ৮শ’র মতো গান সংগ্রহ করা গেছে। এরই অন্যতম ‘খাঁচার ভিতরে অচিন পাখি’ গানটি । এখানে খাঁচা হচ্ছে মানব দেহ আর অচিন পাখিটি হচ্ছে মানবাত্মা । গানটির রচনাকাল সম্পর্কে লালন গবেষক ও লেখক আবুল আহসান চৌধূরী বলেন, শতবর্ষী লালন সম্ভবত তার যৌবনকালে গানটি রচনা করেন । লালনের এই গানটি প্রচন্ডভাবে আলোড়িত করেছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে । এ সম্পর্কে আবুল আহসান বলেন, কবি এই গানটি শুনে মুগ্ধ হয়েছিলেন । লালনের প্রতি কবির অনুরাগ ও মনোযোগের মূলে ছিল এই একটি মরমী গান । তার গোরা উপন্যাসে এই গানটি ব্যবহার আছে । জীবনস্মৃতিতেও তিনি উল্লেখ করেছেন এ গানের কথা । লালনের এই গানের সঙ্গে তিনি ইংরেজ কবি শেলির তুলনা করেছেন। রবীন্দ্রনাথ যে রবীন্দ্র বাউলে রূপান্তরিত হয়েছিলেন, তার মূলেও এ গানের অবদান আছে। সাধক লালনের এই অসাধারণ গানের অন্তর্গত ভাব সম্পর্কে আবুল আহসান চৌধূরী বলেন, গানটিতে মানবদেহকে খাঁচা আর পাখিকে আত্মা হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে । এ গানে আধ্যাত্মবাদের পাশাপাশি হৃদয়কাড়া সুর-মহিমায় শৈল্পিক সৌন্দর্য ও অপূর্ব কবিত্ব ফুটে উঠেছে । শিল্পী ফরিদা পারভীন গানটির শেষ অংশের ভাব বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বলেন, ‘মন ত্ইুর্ ইলি খাঁচার আশে, খাঁচা যে তোর কাঁচা বাঁশে-অংশে লালন ফকির বোঝাতে চেয়েছেন মানবজীবন কত অসার । তাই মানুষের ছোট্ট জীবনকে সুন্দরভাবে গড়ে তুলতে হবে । মানবকল্যাণে এগিয়ে আসতে হবে মানুষকে। কেননা জীবনটা কাঁচা বাঁশের মতোই। আর কাঁচা বাঁশে ঘুণ ধরতে বেশি সময় লাগে না ।

১৬তম স্থানে-কাজী নজরুল ইসলামের ‘কারার ঐ লৌহ কপাট’

বিবিসির শ্রোতা জরিপে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ২০টি বাংলা গানের তালিকায় ১৬তম স্থান পেয়েছেন ‘কারার ঐ লোহ কপাট’ ভেঙে ফেল কররে লোপাট’ গানটি। পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে দেশকে মুক্ত করার ক্ষেত্রে অকল্পনীয় ভূমিকা রাখায় এ প্রতিবাদী গানটি সেরা গানের তালিকায় চলে এসেছে । বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম গানটি রচনা করেন ১৯২১ সালের ডিসেম্বর মাসে । এটি প্রথম গাওয়া হয় দেশনেতা সুভাষ চন্দ্র ঘোষের সভায় । জাদুকরী অনুপ্রেরণা দানকারী এ গানটি ব্রিটিশ সরকার নিষিদ্ধ করেছিল । তখন যারা এ গান গাইতেন তার্দেই জেলে ঢোকানো হতো । পরাধীনতার জিঞ্জির ভাঙার গান হিসেবে পরিচিত এ গান ব্রিটিশ শাসনবিরোধী আান্দোলনের সময় ছিল সবার মুখে মুখে । অবস্থা এমন হয়েছিল যে, এ গান না গাইলে আন্দোলনকারীরা তখন উদ্যম-উৎসাহ পেতেন না । বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনেও গানটি সবাইকে অনুপ্রাণিত করেছে । জানা যায়, বিট্রিশ শাসনামলে এ গান গাইতে গাইতে একজন আন্দোলনকারী আবেগের তোড়ে নিজের হারমোনিয়াম পর্যন্ত ভেঙ্গে ফেলেছিলেন । নজরুল বিশেষজ্ঞ জিয়াদ আলীর মতে, এটি একটি সার্থক গান । এ গানের তেজস্বিতা, শক্তিমত্তা, জঙ্গি মনোভঙ্গি অসাধারণ । কবির অসাধারণ শৈল্পীক গুণাবলী এতে দারুণভাবে ফুটে উঠেছে । গানটির প্রতি অস্বাভাবিক দূর্বলতা ছিল স্বয়ং বিদ্রোহী কবির । এ সম্পর্কে প্রবীণ শিল্পী ধীরেন্দ্র সু জানান, অসুস্থ্য নজরুলকে তিনি গানটি শুনিয়েছিলেন।এ সময় কবির ঠোঁট কেঁপে কেঁপে উঠেছিল। চোখে এসেছিল পানি । এক ধরনের চাঞ্চল্য জেগে উঠেছিল অসুস্থ্য কবির মনে ।
উল্লেখ্য, ১ বৈশাখ (১৪ এপ্রিল) থেকে বিবিসি শ্রোতাদের মতামত অনুযায়ী নির্বাচিত সেরা ২০টি বাংলা গানের প্রচার শুরু করে । এ তালিকায় ১৭তম স্থান হয়েছে ‘এই পদ্মা, এই মেঘনা, গানটি। ১৮তম স্থানে রয়েছে ‘চল চল চল, উর্ধ্বগগনে বাজ মাদল, ১৯তম স্থানে ‘একতারা তুই দেশের কথা বলরে এবার বল’ এবং ২০ তম স্থানে রয়েছে ‘তুমি কি দেখেছ কভু জীবনের পরাজয় ’।

১৭তম স্থানে- ‘এই মেঘনা, এই যমুনা, সুরমা নদী তটে”

বিবিসির শ্রোতাদের মতামত জরিপে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ২০টি বাংলা গানের মধ্যে ১৭ তম স্থান দখল করেছে ‘এই পদ্মা, এই মেঘনা, এই যমুনা, সুরমা নদী তটে’ গানটি। গানটিতে নদীমাতৃক বাংলাদেশের প্রকৃত চিত্র ফুটে ওঠায় এবং অরাজনৈতিক হওয়ায় এটি সর্বশ্রেষ্ঠ গানের তালিকায় চলে আসে । গানটি গেয়েছেন ফরিদা পারভীন । গানটি সম্পর্কে তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর বাংলা একাডেমীতে প্রাচী শিল্পীগোষ্ঠির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে গানটি প্রথম গাওয়া হয় । গানের সুরকার ও গীতিকার আবু জাফর জানান, গানটি ১৯৭৩ সালে রচনা করা হয়। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশকে নিয়ে তার মধ্যে যে আবেগ সৃষ্টি হয় তা তিনি তুলে ধরেন এই গানে ।

১৮তম স্থানে- ‘চল চল চল, উর্ধ্ব গগনে বাজে মাদল’

বিবিসির শ্রোতাদের বিচারে ১৮তম সেরা গান নির্বাচিত হয়েছে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘চল চল চল, উর্ধ্ব গগনে বাজে মাদল’ গানটি । এটি বাংলাদেশের রণসঙ্গীত ।

একতারা তুই দেশের কথা বলরে এবার বল’-এই গানটি পেয়েছে ১৯তম স্থান ।

গানটি গেয়েছেন শাহনাজ রহমতউল্লাহ । আর এর গীতিকার গাজী মাজহারুল আনোয়ার এবং সুরকার আনোয়ার পারভেজ ।

২০তম স্থানে- ‘তুমি কি দেখেছ কভু জীবনের পরাজয়’

বিবিসির জরিপে ২০তম সেরা গান হয়েছে ‘তুমি কি দেখেছ কভু জীবনের পরাজয় ’। এর শিল্পী আবদুল জব্বার । গীতিকার ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান এবং সুরকার সত্য সাহা । (-চিত্রা বিচিত্রায় পৃর্বে প্রকাশিত ।)

 

Post a Comment

0 Comments