দাসপ্রথা বিলুপ্তির আন্দোলন
গবাদি পশুর মতোই একসময় হাটে-বাজারে কেনাবেচা হতো মানুষ। বিক্রি করে দেওয়া হতো দাস হিসেবে। ডাচরা সর্বপ্রথম আফ্রিকান কালো মানুষদের খাঁচায় বন্দি করে আমেরিকায় নিয়ে আসে, সেই থেকে ওই অঞ্চলে পরিচয় ঘটে মানুষ বেচা-কেনার প্রথা বা দাসপ্রথার সঙ্গে। তখনই মূলত জন্ম হয় আমেরিকার ইতিহাসের অন্যতম ঘৃণ্য এক সংস্কৃতির। মানুষের কাছে মানুষ হয় বন্দি। মানবতা পদদলিত হতে থাকে শতাব্দীর পর শতাব্দী। এই বর্বর প্রথাকে উচ্ছেদ করার জন্য হয়েছে আন্দোলন-সংগ্রাম। এর ফলে দুনিয়া থেকে ধীরে ধীরে বিলুপ্তি ঘটে দাসপ্রথার।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৬১৯ সালে একটি ডাচ জাহাজে করে ২০ জন আফ্রিকান মানুষকে নিয়ে আসা হয় ভার্জিনিয়ার জেমসটাউনে। ভার্জিনিয়াসহ গোটা আমেরিকা তখন ছিল ব্রিটিশ উপনিবেশভুক্ত। তখন উত্তর আমেরিকায় খুঁটি গেড়ে বসেছে ইউরোপীয় সওদাগররা। তারাই ছিল তখনকার আমেরিকান সমাজের জোতদার, জমিদার কিংবা মহাজন। তারা দেখতে পেলো, স্বাধীন শ্বেতাঙ্গ মাসিক বেতনভোগী চাকরদের বদলে এ আফ্রিকানদের কিনে নিয়ে দাস হিসেবে ব্যবহার করা গেলে অনেক পয়সা বেঁচে যায়। ঐতিহাসিকদের মতে, অষ্টাদশ শতকে আনুমানিক ৬০-৭০ লাখ কৃষ্ণাঙ্গ দাসকে আফ্রিকা থেকে আমেরিকায় আমদানি করা হয়েছিল। এরা ছিল আফ্রিকা মহাদেশের সবচেয়ে স্বাস্থ্যবান ও যোগ্যতাসম্পন্ন নর-নারী।
এমনভাবে দাসদের নিয়ন্ত্রণ করা হতো, যাতে তারা সম্পূর্ণরূপে প্রভুদের আয়ত্তে থাকে। দাসদের আলাদা একটা গণ্ডি ছিল। একজন দাস আরেকজন দাসকেই শুধু বন্ধু বা সঙ্গী হিসেবে পেতে পারত। নির্দিষ্ট সীমানার বাইরে তারা যেতে পারত না। দাসদের জন্য পড়ালেখা শেখা ছিল নিষিদ্ধ। তবে প্রভুরা তাদের অধীনে থাকা দাসীদের চাইলেই ভোগ করতে পারতেন। কেউ বিদ্রোহ করতে চাইলে তার ওপর নেমে আসতো কঠোর শাস্তি। দাসদের মধ্যে যারা বেশি দক্ষ বা পারদর্শী অথবা শিল্পী, তাদের অন্য দাসদের থেকে অধিক মর্যাদা দেওয়া হতো। এতে করে দাসশ্রেণির মধ্যেও উঁচু-নিচু জাতের বৈষম্য সৃষ্টি করতে পেরেছিল শাসকরা। স্বাভাবিকভাবেই অধিক সম্মানপ্রাপ্ত দাসরা তাদের থেকে নিচু জাতের দাসদের তাচ্ছিল্যের চোখে দেখত। এ কারণে কৃষ্ণাঙ্গ দাসরা সবাই এক হয়ে শ্বেতাঙ্গ প্রভুদের লাঞ্ছনার প্রতিবাদ করতে পারেনি।
মাঝেমধ্যে অবশ্য ছোট ছোট দাস বিদ্রোহ সংঘটিত হতো। বিদ্রোহগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল গ্যাব্রিয়েল প্রশের নেতৃত্বে রিচমন্ড বিদ্রোহ (১৮০০) এবং ডেনমার্ক ভেসার নেতৃত্বে চার্লসটন বিদ্রোহ (১৮২২)। কিন্তু খুবই কম সংখ্যক আন্দোলনই সফলতার মুখ দেখেছিল। প্রভুরা কঠোর হাতে এসব আন্দোলন দমন করতেন। তবে যে দাস আন্দোলনটি শ্বেতাঙ্গ প্রভুগোষ্ঠীর ভিত কাঁপিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিল সেটি সংঘটিত হয় ১৮৩১ সালের আগস্টে। ভার্জিনিয়ার সাউদাম্পটন কাউন্টিতে হওয়া সেই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন ন্যাট টারনার, যাঁর সঙ্গী ছিলেন ৭৫ জন প্রতিবাদী দাস। তাঁরা সবাই মিলে দুই দিনে প্রায় ৬০ জন অত্যাচারী শ্বেতাঙ্গকে হত্যা করেন। পরে সরকারি মিলিশিয়ারা এসে অস্ত্রের মুখে আন্দোলন প্রতিহত করে।
এদিকে দক্ষিণে দাসদের বিরুদ্ধে দমননীতির প্রয়োগে উত্তাল হয়ে ওঠে উত্তর আমেরিকা। এক কথায় বলতে গেলে জ্বলতে থাকা দাসপ্রথা বিলোপ আন্দোলনের আগুনে ঘি ঢেলে দেয়। ১৮৩০ থেকে শুরু করে ১৮৬০- এ আন্দোলন ক্রমান্বয়ে শক্তিশালী হতে থাকে। ফ্রেডরিক ডগলাসের মতো কৃষ্ণাঙ্গ দাস নেতাও যেমন এতে নেতৃত্ব দেন, তেমনি শ্বেতাঙ্গ কিছু সমর্থকেরও অবদান কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। মুক্তচিন্তার বাহক পত্রিকা দ্য লিবারেটরের প্রতিষ্ঠাতা উইলিয়াম লয়েড গ্যারিসন, দাসপ্রথার বিরুদ্ধে লেখা তুমুল জনপ্রিয় উপন্যাস আঙ্কল টম'স কেবিনের লেখক হ্যারিয়েট বেকার স্টোরা ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ কিছু শ্বেতাঙ্গ ব্যক্তিত্ব, যাঁরা দাসপ্রথা লোপের জন্য কৃষ্ণাঙ্গদের সমর্থন দিয়েছিলেন।
একটা সময়ে এসে দাসপ্রথা নিয়ে আমেরিকায় রাজনৈতিক সমস্যা দেখা দেয়। আরও কিছু সমস্যা মিলিয়ে ১৮৬১ সালে দেখা দেয় গৃহযুদ্ধ। অবশেষে ওই গৃহযুদ্ধের মাঝেই আসে ঐতিহাসিক ঘোষণা। ১৮৬২ সালে প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন দাস মুক্তির ঘোষণাপত্র প্রচার করেন। এতে বলা হয়, ১৮৬৩ সালের ১ জানুয়ারি থেকে সব দাস মুক্ত নাগরিক বলে গণ্য হবেন এবং কৃষ্ণাঙ্গরা যুক্তরাষ্ট্রের সম্মানিত নাগরিক হিসেবে সব ধরনের অধিকার ভোগ করবেন। এরই সঙ্গে সমাপ্ত হয় আমেরিকা তথা বিশ্ব ইতিহাসের কুখ্যাত প্রথা স্ল্যাভারি। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আয়োজন। সূত্রে -সমকাল: ২৯ সেপ্টেম্বর ২২


0 Comments