১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ: সেক্টর ও সেক্টর কমান্ডারদের বীরত্বগাথা
১৯৭১ সালে সংগঠিত বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ পরিচলনায় অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে যুদ্ধ পরিচালনার জন্য বাংলাদেশের সমগ্র ভূখণ্ডকে ১১টি যুদ্ধক্ষেত্র বা সেক্টরে ভাগ করা হয়।
সেক্টর গঠন ১৯৭১ সালের ২৯ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে কলকাতায় অনুষ্ঠিত মন্ত্রীসভার বৈঠকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। তাতে বলা হয়ঃ "সশস্ত্র বাহিনী সম্পর্কে সিদ্ধান্ত হল যে প্রধান সেনাপতি অফিসারদের একটি তালিকা প্রস্তুত করবেন। সেনা কমান্ডকে সমন্বিত করে কঠোর শৃংখলার মধ্যে আনতে হবে। বাংলাদেশ বাহিনীতে প্রশিক্ষণার্থীদের বাছাইপর্বে যথাযথ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।" আর এভাবে সুসংগঠিত সেনা কমান্ডের শুরু হয়। এরপর জুন মাসে প্রধানমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে যুদ্ধ পরিস্থিতির সার্বিক পর্যালোচনা করে সুষ্ঠু প্রশাসনিক ব্যবস্থার অধীন যুদ্ধ-অঞ্চল (সেক্টর) গঠনের সিদ্ধান্ত হয় এবং এই লক্ষ্যে জরুরী ভিত্তিতে সমন্বয় সভা আয়োজনের জন্য কর্নেল ওসমানীকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেয়া হয়। এরপর ১০ থেকে ১৭ জুলাই কলকাতায় সেক্টর কমান্ডারদের একটি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ৷ সেই সম্মেলনে বাংলাদেশকে কয়টি সেক্টরে ভাগ করা হবে, কে কোন সেক্টরের কমান্ডার হবেন, কয়টা ব্রিগেড তৈরি হবে, ইত্যাদি বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। ১১ জুলাই মুজিবনগরে উচ্চপদস্থ ও সামরিক কর্মকর্তাদের বৈঠকে মুক্তিবাহিনীর যুদ্ধাঞ্চল ও যুদ্ধকৌশল সম্মন্ধে বিস্তারিত আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। সেখানে কর্নেল মহম্মদ আতাউল গণি ওসমানী কে জেনারেল হিসাবে পদোন্নতি দেয়া হয় এবং সর্বজ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা হিসাবে মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক নিয়োগ করা হয়। লেঃ কর্নেল আবদুর রব সেনা প্রধান, গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ.কে. খন্দকার উপ-প্রধান এবং মেজর এ আর চৌধুরী অতিরিক্ত উপ-প্রধান নিযুক্ত হন।[২] এই সম্মেলনে বাংলাদেশের সমস্ত যুদ্ধাঞ্চলকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করা হয়। প্রতিটি সেক্টরের নেতৃত্বে ছিলেন একজন সেক্টর কমান্ডার। ১০ম সেক্টরটি সর্বাধিনায়কের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়। এই সেক্টরের অধীনে ছিলো নৌ কমান্ডো বাহিনী এবং সর্বাধিনায়কের বিশেষ বাহিনী। সেক্টর ও উপসেক্টরসমূহের তালিকা- সুষ্ঠুভাবে যুদ্ধ পরিচালনার সুবিধার্থে প্রতিটি সেক্টরকে কয়েকটি করে উপ-সেক্টরে ভাগ করা হয়। নিচের ছকে সেক্টর এবং উপ-সেক্টরগুলোর বিবরণ দেয়া হলো। সেক্টর কমান্ডারেরা নিজ নিজ সেক্টরে মুক্তি যোদ্ধাদের সংগঠিত করতেন, তাদের থাকা-খাওয়ার ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে, তাদের এলাকায় আক্রমণের পরিকল্পনা করতেন। তাদের নেতৃত্বে যুদ্ধ পরিচালনা হতো: মুক্তিযুদ্ধের ১১টি সেক্টর ১ নং সেক্টর:
চট্টগ্রাম ও পাবর্ত্য চট্টগ্রাম এলাকা ছিল ১ নং সেক্টরের অন্তর্ভুক্ত। ফেনী নদী থেকে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি ও ফেনী পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল এই সেক্টর। ১৯৭১ সালের এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত এই সেক্টরের কমান্ডার হিসেবে মেজর জিয়াউর রহমান দায়িত্বরত ছিলেন।
২ নং সেক্টর:
ঢাকা, নোয়াখালী, ফরিদপুর ও কুমিল্লার অংশবিশেষ ছিল সেক্টর ২ এর অংশ।
মেজর কেএম খালেদ মোশাররফ এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন। সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত মেজর এটিএম হায়দার এই সেক্টরের কমান্ডার হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন৷
৩ নং সেক্টর : কুমিল্লা, কিশোরগঞ্জ ও হবিগঞ্জ ছিল ৩ নং সেক্টরের অন্তর্ভুক্ত। হবিগঞ্জ, আখাউড়া–ভৈরব রেললাইন থেকে পূর্ব দিকে কুমিল্লা জেলার অংশবিশেষ এবং কিশোরগঞ্জ ও ঢাকার কিছু অংশ নিয়ে গঠিত হয়েছিল ৩ নং সেক্টর। মেজর কেএম শফিউল্লাহ এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এ সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন । মেজর এএনএম নুরুজ্জামান সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত এই সেক্টরের কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেন । ৪ নং সেক্টর : মৌলভীবাজার ও সিলেটের পূর্বাংশ সেক্টর ৪ এর অংশ ছিল। মূলত সিলেট জেলার অংশবিশেষ নিয়ে গঠিত হয়েছিল ৪ নং সেক্টর। মেজর সিআর (চিত্তরঞ্জন) দত্ত এবং ক্যাপ্টেন এ রব ছিলেন সেক্টর নং ৪ এর কমান্ডার। ৫ নং সেক্টর: বৃহত্তর ময়মনসিংহের সীমান্তবর্তী অঞ্চল এবং সিলেট জেলার অংশ বিশেষ নিয়ে গঠিত হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের ৫ নং সেক্টর। সেক্টর নং ৫ এর সদর দপ্তর ছিল সুনামগঞ্জ জেলার ছাতকের বাঁশতলায়।
এই সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার ছিলেন মেজর মীর শওকত আলী । ৬ নং সেক্টর : রংপুর বিভাগ ছিল সেক্টর ৬-এর অন্তর্ভুক্ত। দিনাজপুরের ঠাকুরগাঁও মহাকুমা ও ব্রহ্মপুত্র নদের তীরবর্তী অঞ্চল ব্যতীত সমগ্র রংপুর নিয়ে গঠিত হয়েছিল সেক্টর নং ৬। কমান্ডার এমকে বাশার সেক্টর নং ৬-এর কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন ৷ ৭ নং সেক্টর: রাজশাহী বিভাগ ছিল সেক্টর ৭-এর অন্তর্ভুক্ত। রাজশাহী, পাবনা, ব্রহ্মপুত্র নদীর তীরবর্তী এলাকা ব্যতীত সমগ্র বগুড়া, দিনাজপুরের দক্ষিণ অঞ্চল ও রংপুরের কিছু অংশ নিয়ে গঠিত হয়েছিল সেক্টর নং ৭। মেজর নাজমুল হক, সুবেদার মেজর এ রব ও মেজর কাজী নুরুজ্জামান- এই তিনজন সেক্টর নং ৭ এর কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ৮ নং সেক্টর : কুষ্টিয়া, যশোর, দৌলতপুর সাতক্ষীরা সড়ক পর্যন্ত খুলনা জেলা ও ফরিদপুরের কিছু অংশ নিয়ে গঠিত হয়েছিল সেক্টর নং ৮। এপ্রিল থেকে আগস্ট পর্যন্ত এই সেক্টরের কমান্ডার হিসেবে মেজর আবু ওসমান চৌধুরী দায়িত্বরত ছিলেন ও আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত এই সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন মেজর এম এ মঞ্জুর। ৯ নং সেক্টর: সুন্দরবন ও বরিশাল বিভাগ সেক্টর ৯ এর অন্তর্ভুক্ত ছিল। পটুয়াখালী, বরিশাল ও খুলনার কিছু অংশ নিয়ে গঠিত হয়েছিল সেক্টর নং ৯।
এই সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার ছিলেন মেজর এম এ জলিল। ১০ নং সেক্টর: সকল নৌপথ ও সমুদ্র উপকূলীয় অঞ্চল ছিল সেক্টর নং ১০-এর অংশ। সমুদ্র উপকূলীয় অঞ্চল, নৌ কমান্ডো ও আভ্যন্তরীন নৌ-পরিবহন সেক্টর নং ১০-এর অধীনে ছিল। ১০ নং সেক্টরের কোনো সাব-সেক্টর ছিল না এবং ছিল না নিয়মিত কোনো সেক্টর কমান্ডার। এই সেক্টরে নৌ কমান্ডোরা যখন যে সেক্টরে মিশনে নিয়োজিত থাকতেন, তখন সে সেক্টরের কমান্ডারের নির্দেশে কাজ করতেন। ১১ নং সেক্টর : বৃহত্তর ময়মনসিং বিভাগ ছিল সেক্টর নং ১১-এর অন্তর্ভুক্ত। কিশোরগঞ্জ বাদে ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইল জেলা নিয়ে গঠিত হয়েছিল সেক্টর নং ১১। মেজর এম আবু তাহের এপ্রিল থেকে ৩ই নভেম্বর পর্যন্ত ১১ নং সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তারপর এই সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার ছিলেন ফ্লাইট লেফট্যান্যান্ট এম হামিদুল্লাহ।
সুত্রে- -উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

0 Comments