চিন্তার বিচিত্রতা, ভিনদেশি শব্দের
প্রাণবন্ত ব্যবহার ও সাহিত্যের সব শাখায় সাবলীল পদচারণা সব্যসাচী বিদ্রোহী
কবি নজরুল ইসলামকে দিয়েছে বহুমাত্রিকতা। চির যৌবনের উদ্দীপনা নিয়ে নজরুল
যেন তার ভাষায় বিশ্বজগৎ নিয়ে আপন মনে খেলা করা এক বিরাট শিশু। নজরুলের
ভাবনার জগৎ নবীনের কৌতূহল, তারুণ্যের দীপ্তি, শোষণ-শাসন-ত্রাসের বিরুদ্ধে
দ্রোহ, সুন্দরের প্রতি প্রেম, মানবিকতার জয়গান, ভণ্ডামি-ধর্মান্ধতার প্রতি
তীব্র শ্নেষ, অসাম্প্রদায়িক চেতনা, পরাধীনতার শেকল ভাঙার দৃঢ়প্রত্যয়ে চির
ভাস্বর। তার সাহিত্যের প্রাণপ্রাচুর্যময় বহুমাত্রিক রংধনুকে একটি বা দুটি
রঙে আঁকলে নজরুলের খণ্ডিত চিত্র পাওয়া যায়। কাজী নজরুল একই সঙ্গে
চিরবিদ্রোহী, চিরপ্রেমিক, মননে অসাম্প্রদায়িক, সাম্যবাদী ও স্বাধীনতার
প্রথম তূর্য বাদক সাহিত্যিক। বিদ্রোহী কবি নজরুল কবিতা, উপন্যাস, গল্প,
আত্মকাহিনি, গীতিনাট্য, গান লিখেছেন। পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে সমসাময়িক
প্রেক্ষাপটে প্রবন্ধও লিখেছেন। অপেক্ষাকৃত কম আলোচিত নজরুলের প্রবন্ধ
সাহিত্যে। প্রত্যক্ষ ইংরেজ বিরোধিতা, অসাম্প্রদায়িকতা, শ্রমিক-কৃষকের
দুঃখকথা, পরাধীনতার শেকল ভাঙা, স্বাধীনতার চেতনার জাগরণ ও স্বাধীনতার প্রথম
দাবি প্রকাশ্যে উত্থাপিত হয়েছে। নজরুলের প্রবন্ধ গ্রন্থের মধ্যে যুগবাণী,
রাজবন্দীর জবানবন্দি, রুদ্রমঙ্গল, দুর্দিনের যাত্রী, ধূমকেতু বিশেষভাবে
উল্লেখযোগ্য। এসব প্রবন্ধ গ্রন্থে নজরুল তৎকালীন উপমহাদেশের পরাধীনতার শেকল
ভাঙার আহ্বান, হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা জিইয়ে রেখে জুলুম-নির্যাতনের অপশাসনের
বিরুদ্ধে অসাম্প্রদায়িকতার জয়গান, শ্রেণিসংগ্রাম তথা সাম্যবাদ ও বাঙালির
চেতনায় স্বাধীনতার বীজমন্ত্র বুননের সুস্পষ্ট নির্দেশনা পরিলক্ষিত হয়।
নজরুলের প্রবন্ধের বড় বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট দ্বিধাহীন উচ্চারণ, ভাষা প্রকাশের দোর্দণ্ড পৌরুষ এবং গদ্যের কাব্যময় প্রাণশক্তি। ধূমকেতু পত্রিকায় ১৯২২ সালে প্রকাশিত 'আনন্দময়ীর আগমনে' কবিতায় ব্রিটিশ রাজের সমালোচনা করে বিপ্লবীদের জয়গান গাওয়ায় রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে কবি নজরুলকে এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। জেলে থাকা অবস্থায় নজরুল যে জবানবন্দি দেন, তা-ই রাজবন্দীর জবানবন্দি হিসেবে প্রকাশিত হয়। জবানবন্দিতে নজরুল বলেন, 'আমি রাজদ্রোহী। তাই আমি আজ কারাগারে বন্দি। একাধারে রাজার মুকুট আর ধারে ধূমকেতুর শিক্ষা। একজন রাজা হাতে রাজদণ্ড, আর জন সত্য, হাতে ন্যায়দণ্ড।' এখানে নজরুল ইংরেজ দুঃশাসন ও তাদের স্বার্থবাদী আইনের বিরুদ্ধে সত্য ও ন্যায় এবং জনগণের আর্তচিৎকার দাঁড় করিয়েছেন। প্রবন্ধের শেষের দিকে উল্লেখ করেছেন, 'আমার হাতের ধূমকেতু এবার ভগবানের হাতের অগ্নিমশাল হয়ে অন্যায়-অত্যাচারকে দগ্ধ করবে।' বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ যে কথা বলেছেন তা হলো, 'আমি ভগবানের হাতের বীণা। বীণা ভাঙলেও ভাঙতে পারে, কিন্তু ভগবানকে ভাঙবে কে?' শেষ যে বাক্যটি সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলেছে বাঙালির ইতিহাসে, তা 'আমার অসমাপ্ত কর্তব্য, অন্যের দ্বারা সমাপ্ত হবে'।
'ধূমকেতুর পথে' প্রবন্ধে কাজী নজরুলের বিপ্লবী সত্তার পূর্ণ বিকাশ লক্ষ্য করা যায়। এ প্রবন্ধে কাজী নজরুল প্রথম ভারতীয় সাহিত্যিক হিসেবে প্রকাশ্যে পত্রিকায় ভারতের স্বাধীনতার দাবি তুলে বলেন, 'স্বরাজ-টরাজ বুঝি না, কেননা ও কথাটার মানে এক এক মহারথী এক এক রকম করে থাকেন। ভারতবর্ষের এক পরমাণু অংশও বিদেশির অধীন থাকবে না। ভারতবর্ষের সম্পূর্ণ স্বাধীনতা রক্ষা, শাসনভার, সব থাকবে ভারতীয়ের হাতে। সরাসরি বিদ্রোহ ছাড়া স্বাধীনতা লাভ করা সম্ভব নয়। এ কথা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে নজরুল 'ধূমকেতুর পথে' প্রবন্ধে সুস্পষ্টভাবে আহ্বান করেন, 'পূর্ণ স্বাধীনতা পেতে হলে সকলের আগে আমাদের বিদ্রোহ করতে হবে সকল কিছু নিয়মকানুন বাঁধন-শৃঙ্খল মানা নিষেধের বিরুদ্ধে।'
ইংরেজ শাসনের নির্মম অত্যাচার-নির্যাতনের বিরুদ্ধে বিশেষত জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে নজরুল রচনা করেন 'ডায়ারের স্মৃতিস্তম্ভ' ও 'কালা আদমীকে গুলি মারা' প্রবন্ধ দুটি। ব্যঙ্গাত্মক রচনা 'ডায়ারের স্মৃতিস্তম্ভ'তে নজরুল অত্যাচারী নৃশংস জেনারেল ডায়ারের বিরুদ্ধে ভারতবাসীর মনে তীব্র ঘৃণা জাগাতেই লিখেছেন, 'আমাদের মুমূর্ষু জাতিকে চিরসজাগ রাখিতে দুশমন ডায়ারের স্মৃতিস্তম্ভের চূড়া এত উচ্চ হবে যেন ভারতের যে কোনো প্রান্ত হতে স্পষ্ট চোখের সামনে দেখা যায়।' অন্যদিকে 'কালা আদমীকে গুলি মারা' নিবন্ধে বুঝিয়েছেন, কালো মানুষও মানুষ। তার জীবনেরও মূল্য আছে, সেও রক্ত-মাংসে গড়া। কালো মানুষকে নির্বিচারে গুলি করা অপরাধ, তার বিচার চাই। কাজী নজরুল এখনও কতটা প্রাসঙ্গিক, কতটা সমসাময়িক, আজ বিশ্বের নানা প্রান্তে প্রদর্শিত প্ল্যাকার্ডের স্লোগানে 'ব্ল্যাক লাইভ ম্যাটারস' হতেই প্রতীয়মান হয়। জর্জ ফ্লয়েডের বিচারের দাবি নজরুলের লেখার কালোত্তীর্ণতা নির্দেশ করে।
ইংরেজ এই দ্বিমুখী নীতির বিপক্ষে দাঁড়িয়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রতি বজায় রাখতে কাজী নজরুল 'নবযুগ' প্রবন্ধে পারস্পরিক সুসম্পর্ক উন্নয়নের আহ্বান জানিয়ে বলেন, 'এসো ভাই হিন্দু! এসো ভাই মুসলিম! এসো বৌদ্ধ! এসো ক্রিশ্চিয়ান! আজ আমরা সব গণ্ডি কাটাইয়া সব সংকীর্ণতা, সব মিথ্যা, সব স্বার্থ চিরতরে পরিহার করিয়া প্রাণ ভরিয়া ভাইকে ভাই বলিয়া ডাকি।' নজরুল আকুল আবেদন করেছেন, 'আমরা আর বিবাদে জড়াব না, চেয়ে দেখো আমাদের পাশেই শায়িত আমাদের ভাইদের মৃতদেহ।'
বাঙালি
জাতির চেতনায় স্বাধীনতার বীজমন্ত্র প্রোথিত করতে, জাতিকে পরাধীনতার
শেকলমুক্ত করতে কাজী নজরুল ১৯৪২ সালে লিখেন 'বাঙালির বাঙলা' প্রবন্ধ। এর
শিরোনামেই বাঙালির স্বাধীনতার গভীর ঐশীবাণী নিহিত। বাংলা তথা বাংলাদেশ হবে
বাঙালির। বাঙালির স্বাধীন-সার্বভৌম দেশই বাংলাদেশ। এ প্রবন্ধে আরও উল্লেখ
রয়েছে, 'বাংলার আবহাওয়ায় আছে স্বাধীনতার মন্ত্রের সঞ্জীবনী শক্তি। বাংলা
বাঙালির হোক! বাংলার জয় হোক! বাঙালির জয় হোক।' প্রবন্ধের শুরুতেই আশাবাদ
ব্যক্ত করেন, 'বাঙালি যেদিন ঐক্যবদ্ধ হয়ে বলতে পারবে- বাঙালির বাঙলা, সেই
দিন তারা অসাধ্য সাধন করবে।' নজরুলের এই দিব্যবাণী বৃথা যায় নাই। ৩৮ বছর
পরে বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ
হয়ে 'জয় বাংলা' স্লোগান দিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ী হয়ে স্বাধীনতার লাল
সূর্য ছিনিয়ে এনেছে। সূত্রে- সমকাল



0 Comments