সর্বশেষ

6/recent/ticker-posts

Header Ads Widget

জোয়ারের টানে আসে,, ভাটার টানে

 


জোয়ারের টানে আসে,,ভাটার টানে

বর্তমান উপযোগী অত্যাধুনিক ডিজিটাল পার্কে, ফ্যান্টাসি কিংডমে। ঈদের ছুটিতে  দর্শনার্থীদের প্রচন্ড ভিড় । আগেকার রাজা-বাদশাদেরকে,যেমন ভাবে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানাতে তোরণ নির্মাণ করা হতো, তেমনি দর্শনার্থীদেরকে  অভ্যর্থনা জানানোর জন্য  শিশুদের মনস্তাত্ত্বিক উপযোগী করে,বিখ্যাত কার্টুনের চরিত্র গুলোকে স্টিল ফটোগ্রাফিতে সাজিয়ে,আর গেটে তা লাগিয়ে আকর্ষণ করা হয়েছে। ঢুকতে গেটের উপর বিভিন্ন রাইডারের জন্য বিভিন্ন প্যাকেজের মূল্য টাঙ্গিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ দলের ও ও দলের কিংবা এই গ্রুপের সঙ্গে আরেক গ্রুপের, এখানে কথা আদান-প্রদান, পরে কে কি করে, তার বিবরণী এ পক্ষের সঙ্গে  ও পক্ষের,ল্যান্ড ও ডেভোলোপারের ব্যবসা,ক্ষুদ্র লেনদেনের,টোকেন মানি সংগ্রহ, বিশাল লোভনীয় অফার,মূলধন সংগ্রহ,ক্রেতা সংগ্রহ,তার জন্য ঐ গ্রুপের নানা সুন্দর ব্যবহার ও প্রপোজাল। তারপর  আন্তরিকতার আরও মেলামেশার   প্রয়োজন পড়ে । বিভিন্ন দর্শনীয় আইটেমের মধ্যে বাম্পার কার, ম্যাজিক কার্পেট, রোলার কোস্টার । দুই গ্রুপই প্রথমে রোলার কোস্টারে উঠতে শুরু করলো। শুরু করবেন, ঐ গ্রুপের সবচেয়ে সুন্দরী মহিলা,চড়াকালীন সময়, মেশিনে ওড়নার কাপড় লেগে গিয়েছিল প্রায়ই, সঙ্গে- সঙ্গে-এ গ্রুপ,ও গ্রুপ এবং আরো অন্যান্য গ্রুপের লোকেরা বিশাল চিৎকার দিল।  “থামান    থামান”।  চিৎকারের ফলে রোলার কোস্টারের চালক আরম্ভ করে আবার থামিয়ে দিল। আবার সব ঠিকঠাক করে চালু করল। সব শেষ হবার পর এ গ্রুপ - ও গ্রুপ, সবাই ওই মহিলাটাকে ঘিরে ধরলো। মহিলা ঐ গ্রুপের লিডার। ঐ বাড়ির কারোর শাশুড়ি,কারোর খালাম্মা,  কারোর মা। সেতারা বেগম,বয়স্কা মানুষ, নাতি-নাতনী, ছেলে ,ছেলের  বউকে সঙ্গে নিয়ে  এসেছেন, আজ তার জন্মদিন। আরো তার দুই ভাই  ও তাদের স্ত্রী এবং দুই বোন। া আন্ডা- বাচ্চা, কার পার্কিং  গ্যারেজে, সেখানে গাড়ি রাখা আছে।   পার্কের বাইরে, এই উপলক্ষে দুই গ্রুপের মধ্যে যোগাযোগ আরো নিবিড়তর হল। মোবাইল নাম্বার বিনিময় হল। অন্যদিকে অন্য গ্রুপের জমির ব্যবসার, ডেভোলোপারের ব্যবসার কার্ড বিনিময় হল। কোম্পানির নাম ফিউচার “ডেভেলপমেন্ট” পরে এখান থেকে বিদায় হল। কিছুদিন পর অফিসে উনারা গেলেন।  আবারো আন্তরিকতার বন্যা বইয়ে গেল। বুশিয়ার দেওয়া হলো। মিষ্টিমুখ করানো হলো। একজন মহাপরিচালক কোম্পানির প্রধান। অনেকগুলো গ্রুপে ভাগ হয়ে,একজন গ্রুপ লিডার বা পরিচালক। একজন পরিচালক নিয়মিত অফিস খোলেন, দপ্তর পরিচালনা করে থাকেন । অন্যজনও পরিচালক, তারা অফিসে কাজ করেন না। সে তার পরিচালনা, বাইরে থেকে ক্রেতা সংগ্রহ করে থাকেন। সেও পরিচালক।  মাসুকে রাসুল (আমিন) সে হচ্ছে দপ্তর  ও ক্রেতা দুটোই সামলান। আরেকজন সদস্য সদ্য কিছুদিন আগে ব্যাংক থেকে অবসরে গেছেন। পরিচালক আবুল খয়রাত। আগেই কথা ছিল এই প্রোগ্রামে উনি থাকবেন।

সেতারা বেগমের দুই ছেলে কাজী নাজমুল হুদা তাপস ও কাজী শামসুল হুদা পলাশ। যদিও বলে তারা স্থানীয় । কিন্তু যশোরের আঞ্চলিকতার টান এসে যায়। ঢাকা শহরে একটা ফ্ল্যাট, কিন্তু ভাড়া  দেওয়া,কেউ থাকে না । যশোরে অনেকগুলো বাসা- বাড়ি, চালের মিল, পাটের  আড়ত,অনেক দোকানপাট রয়েছে। এমনকি একটি আধুনিক শপিংমল রয়েছে, অভাব থাকার কথা নয়। তবুও তাদেরকে বাড়তি কামাইয়ের জন্য চিন্তা করা লাগে। বিপরীত দিকে তাদের সুন্দর ব্যবহার ও মিষ্ঠি কথার কথা অব্যাহত চাপের কারণে অফিসে অন্তর্ভুক্ত হতে বাধ্য হয়েছেন । খুশি মনে মূলধন খাটাতে রাজি হয়েছে’। তাদের দুজনের ক্রমাগত চাপ,খয়রাত ও আমিন সাহেবের চাপ। চাপাচাপি বিফলে যায়নি। এর আগেই ফ্যান্টাসি কিংডমে থাকতেই কথা হয়েছিল। এতদিন পর তারা অফিসে আসলো। সঙ্গে খয়রাত সাহেব উপস্থিত ছিলেন। তাদের দুজনের সঙ্গে  তাপস ও পলাশ ছাড়া,যশোরে অবস্থানকারী অন্যান্য আত্মীয়-স্বজন। অফিসে একগাদা লোক নিজেদের মধ্যে যশোরের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলা শুরু করলো । প্রথমে হাত মেলানো হল। সঙ্গে সালাম বিনিময়। পিছনের লোক চুপচাপ আছে। সামনের সারির লোক বললেন,-”কি রম আছেন” তাপস,-” আমগের কাছে এটা বড়ই সৌভাগ্যে বিষয়,আপনাদের সঙ্গে,দেখা সাক্ষাত কর্তি পাসছি। এক সঙ্গে বুসে দুটো কথা বলতে পাসছি “। আমিন -,”অত বড় কথা বলতে হবে না। আমাদের কাছে  সব কাস্টমার সবাই সমান”। পলাশ,-” আপনেরা দয়া কইরে,আপনাদের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত কইরে নিবেন। ইটা আমরা আশা করি “। ধনু রাশির জাতক খয়রাত সাহেব অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী, -”চোখ বন্ধ করে ইনভেস্ট করেন “। মিশুক ও হাসি খুশি মানুষ। তার স্পষ্ট জবাব,-”আশা করি  ঠকবেন না  “। আমিন সাহেব, -” আপনারা একেকজন করে  একেকজন আমার কাছে আসেন”। একজন মুরুব্বী গোছের,,- ”আমরা অত শত বুঝিনি বাপু। আপনাদের প্রতি আমাদের বিশ্বাস হান্ড্রেড পার্সেন্ট। টাকা পয়সার অভাব হবিনে। আস্তে আস্তে সব টাকা- পয়সা ইনভেস্ট কইরবো। চিন্তা কইরবেন না। টাকা পয়সা  আরো দেবানি”। পলাশ,-””টাকা পয়সা বিভিন্ন খাতে ছইড়ে আছে, ছিটিইয়ে আছে”। আমিন কর্কট রাশির জাতক। সাধারণ মানুষের প্রতি সবসময়ের জন্য সংবেদনশীল ও নমনীয়। তার ভাষা-নরম নমনীয়। না হলে ক্রেতা আকর্ষণ করা যাবে না। আমীন,-”প্রথমেই তাপস স্যার আছেন, বুঝিয়ে দিই”। তাপস,-”সবাই ভালো কইরে শুইনে নাও, ভালো কইরে বুঝে নাও। উনি যা বলছেন মনোযোগ সহকারে,মন দিয়ে শুইনে দেকোনি। ইরম সিষ্টেমের কথা শুনেনি,আমি এই পরথম শুইনলাম “। খয়রাত,-”আমি নিজেই ব্যাংকের লোক। ব্যাংকও এত ইন্টারেস্ট দেয় না”। আমিন, -”তাড়াহুড়ো করার দরকার নেই, কে কি পরিমাণ করবেন,  কাগজপত্র রেডি করে নিয়ে যান । যেগুলো ঠিক নেই,ঠিক করে নিয়ে আসবেন, অসুবিধা নেই”। খয়রাত, -” আপনি যত ইনভেস্ট করবেন, প্রতি লাখে একুশ  শত পরিমাণ পাবেন লভ্যাংশ, তার ঐ সমপরিমাণ বিনিয়োগকৃত মূলধন ফেরত পাবেন”। ওদের পিছনের একজন  বলে উঠলো,-”যত কইরবো সব ঐ  তাপস স্যার-ঐ পলাশ স্যার  কইরব্যান। আমরা অত শত বুঝে’নি”। খয়রাত, -”আপনাদের পরে ঐ হিসাব বুঝে নিতে হবে। আপাতত উনারা বুঝে নিক”। দুপুরে কোম্পানির ফান্ড থেকে আমিন সাহেব,খয়রাত সাহেবসহ উনাদের সবাইকে সুপেয় ও সুস্বাদু দুপুরের লাঞ্চ হিসেবে মোরগ পোলাও খাওয়ালেন। কাগজপত্র রেডি করে বিদায় দেওয়া হলো। 

জোয়ারের মতো টাকা আসতে শুরু করতে থাকলে, জীবনটা তাই জোয়ারের মতো চলতে থাকে। এতগুলো টাকার ঘ্রানে অজ্ঞান, সেখানে অন্য কিছু চিন্তা করার সময় কম। ফেনীর মোড়ে, ওখানে অনেকগুলো ভাড়া করা ভলভো গাড়ি জড়ো হয়েছে, তাই অন্যরকম ভিড়,ট্রাফিক জ্যাম। গাড়িগুলো ঢাকার উত্তরা থেকে ছেড়ে কুমিল্লা শহর সাইডে রেখে, মাঝখানে চৌদ্দগ্রাম হয়ে  ফেনীতে এসেছে। এখন ফেনীর মোড় ঘুরে যাবে সোনাগাজীর দ্বীপ,চর চান্দায়। মাঝখানে মতিগঞ্জ অতিক্রম করে সোনাগাজী পৌরসভা ডান পার্শ্বে রেখে সোজা চলে যাবে চরচান্দায়। কোম্পানির মাধ্যমে একটা শক্তিশালী সমাজ বা গ্রুপ গড়ে তোলা হয়েছে। তাদের জমজমাট চলার এক পর্যায়ে, তাদের গ্রামে-মফস্বলে জমি ও মৎস্য খামার প্রজেক্টে গিয়ে দেখতে যাওয়ার উসিলায় একমাত্র মানে, এক সঙ্গে শুধু  বনভোজন করতে যাওয়া নয়। কোম্পানির বিশাল প্রজেক্টে আসা মানে দাঁড়ায়,ব্যবসার জমজমাট মনোমুগ্ধকর

 পরিবেশ । তাদের মুখের আশ্বাসের বিশাল আর্থিক নিরাপত্তা সূচক অভয় বাণী পাওয়া। ভলভো বাসের সামনে  ব্যানার টাঙ্গানো “ফিউচার ডেভোলপার লিমিটেড “কোম্পানির বিশাল বনভোজন আয়োজন। গন্তব্য লেখা আছে চরচান্দা, সোনাগাজী, ফেনী। হঠাৎ অনেকগুলো বাসের একত্রে জড়ো হওয়ায় বিরাট হৈচৈ  শুরু হলো। আবার যখম গাড়ি স্ট্যার্ট দিলে রাস্তা ফাঁকা হয়ে নিরব হয়ে রইলো। এক গাড়িতে উঠেছে পূর্ব  নির্ধারিত গ্রুপের লোকেরা। সেই গ্রুপটিতে একসঙ্গে হয়ে, মিল করে বসেছেন। সিরিয়াল করার সুবিধা অনুযায়ী,খয়রাত সাহেব আর পছন্দমত তার পরিচিতকে বসিয়েছে। দুপুরের পর রওনা দিয়ে চলছে সকালের  নাস্তা খাওয়া, চা খাওয়া তা ইতিমধ্যে সম্পূর্ণ হয়েছে। রাতে সুবিধামতো কোন হোটেলে খাওয়া হবে। গন্তব্যে টার্গেট ভোরে পৌঁছানো। তারপর সকালে নাস্তা দিয়ে শুরু হবে পিকনিক। বিকেলে রওনা দিয়ে ঢাকায় চলে আসবে। খয়রাত  

সাহেব তার সঙ্গী পছন্দমত বন্ধু,পাড়ার বন্ধু হাফিজ সাহেবের মত সঙ্গী পেয়ে কথা ও আড্ডা চলছে। দুজনের মোবাইলে নগ্ন ছবি হঠাৎই চলে আসলো, খয়রাত সাহেব বলেন,-” বন্ধ করো বন্ধ করো,মান সম্মান থাকবে না”। প্রতি উত্তর, -” সাধু সাজার দরকার নেই”। একটু দুষ্টুমি। হাফিজ  সাহেব আবারো বললেন,-” ঠাকুর ঘরে কে রে, আমি কলা খাই না”। মোবাইল থেকে পাওয়া আজব রোমান্টিক গল্প।  এই নিয়ে হাসাহাসি চলছে । বিভিন্ন বিভিন্ন ভাবে পাওয়া রসাত্মক গল্প নিয়ে আলোচনা চলছে । হাফিজ সাহেব এই রকম এক ঘটনা দেখালো।  এক প্রবাসী লোক তার স্ত্রীর কাছে অদ্ভুত আবদার করে বসলো। প্রবাসী স্বামীর আবদার হলো, ঐ স্ত্রীর বুক উলঙ্গ করে,তার স্বামীকে দেখাবেন। এবং সঙ্গে সঙ্গে তার স্বামী ক্যামেরা দিয়ে ছবি তুলে নিবেন। বিপদ হল ওই সময় এক শয়তান ওৎ পেত ছিল,সুযোগ বুঝে তা  অনাধিকার  চর্চায় ওর বুকের উলঙ্গ ছবি তুলে, ফেইসবুকে ছড়িয়ে দিল। এত দিনের ভালোবাসার সংসার তাদের ভেঙ্গে গেল। কোন কিছু বেশী বাড়াবাড়ির   ফল  ভালো হলো না । আরেকটা গল্প দেখালেন । প্রায় ত্রিশ-চল্লিশ  বয়সের একজন মহিলা, চাঁদপুর থেকে  মোবাইলে প্রেম করতো,বিক্রমপুরের এক ছেলের সঙ্গে। দুজন দুজনের বয়সের কোন খবর না নিয়ে প্রেম করতো। প্রেমের গভীরতা ধীরে ধীরে বাড়তে বাড়তে তীব্রতর হলো । প্রেম সাচ্চা । তার মধ্যে ছেলেটা নিজেকে  বিশাল ধনসম্পত্তির মালিক  বলে মোবাইলে তা বড় করে  প্রচার করলো। মহিলাটা মনে মনে  পুরোপুরি বিশ্বাস করলো।  চাঁদপুর থেকে উন্মাদের মত চলে আসলো বিক্রমপুরের সেই গ্রামে। দেখে তো অবাক ছেলের বয়স মাত্র ষোলো বা সতেরো হবে। মহিলার বয়স তো ত্রিশ কিংবা পয়ত্রিশ। বাস্তবে ছেলের বাবার কোন জমি কিছুই নেই পরের জমিতে কোনরকম হাল চাষ দিয়ে জীবন কাটায়। এ ছেলে -এ মহিলা নিজেদের মধ্যে কয়েকবার ধাক্কাধাক্কি শুরু করলো। মহিলা চার্জ করছে ছেলেটাকে,বিশাল ধোকার মধ্যে পড়ে গেছে, ছেলের বাবা তো অবাক! ছেলে দোষ দ্যায়  মহিলাকে উল্টো মহিলা দোষ দ্যায় ছেলেটাকে।  বাকী কি হলো? ভিডিও এখানে শেষ।

চাক্ষুষ সামনাসামনি না দেখলে বুঝা যাবে না এটা বাস্তবতা,কাব্য নয় কাব্যময়তা । এই কোম্পানির আধুনিক  সমন্বিত, ডিজিটাল ফর্মেশান, ঘর গুলোকে মনে হচ্ছে বেহেশত খানা। অতো খানি মনে নাও হলেও,তার চেয়ে বেশি মনে হতে পারে,অতি ভক্তির সাহচর্যে এটা কোন খানকা শরীফ বা হুজরা খানা বা দরগা শরীফ । চলে আল্লাহ-রাসূলের ভক্তির  একনিষ্ঠ ভজনা । কোনভাবে এর বাইরে বিশ্বাস হারানো  মহাপাপ । ভক্তি ভরে ভিতরে -ভিতরে,   অন্য কোন ভাব আনা  যাবে না,অন্য কোন কিছুতে। ছোট ছোট স্টিকার দিয়ে দেওয়াল সাজানো।  কুরআন হাদিস সহ অন্যান্য উপদেশ মূলক বাণী উৎকীর্ণ করা হয়েছে। দুপুরে অফিসে কমপালসারি, একসঙ্গে জামাত করে নামাজ পড়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে । আমিন জমি বিক্রির গ্রাহকও ঠিক করছেন । এক সঙ্গে অনেক গ্রাহকদের সঙ্গে কথা বলা হচ্ছে,গ্রাহক সংখ্যা বাড়ানো । একজন পরিচালক- মাসুকে রাসুল (আমীন) গ্রুপ নিয়ে, তাদের কাগজ, নথিপত্র তাদেরকে বুঝিয়ে দিচ্ছেন। সরকার ডিজিটাল ফর্ম কার্যকরী করায় সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে অনেক ।  আর আমিন সাহেব ঘড়ির তালে তালে কাজ করে যাচ্ছেন। বিরামহীন। এমন কি ছুটির দিনে,সেখানেও ঠান্ডা মাথায়,তার কর্মসূচী চালাচ্ছেন। ভালোভাবে বুঝিয়ে গ্রাহক বাড়ানোর কার্যক্রম চালাচ্ছেন। সবাইকে মিষ্টি কথার মারপ্যাচে কনভিন্স করে ফেলছেন । বাণিজ্য মেলায় গিয়েও, রিলাক্স করার ফাঁকে ফাঁকে অফিসের কাজ করে যাচ্ছেন। সেখানেই থেমে নেই ।  সেখানেই তার নামের কার্ড, অফিসের লিটারেচার বিতরণ করছেন। এবং প্রতিবারই গ্রাহকের নম্বর, ঠিকানা লিখে রাখছেন তার নোট বইয়ে। কাজের ফাঁকে ফাঁকে এই সমস্ত কনভিন্সের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। পরে ফোন করে করে, তাগাদা দিয়ে যাচ্ছেন। তারিখে তারিখে ফোন করে যাচ্ছেন।

পূর্বের সিডিউলকৃত কর্মসূচি অনুযায়ী  সকাল দশটায় ফিউচার ডেভোলপার কোম্পানির  নীচের  গ্যারেজে  দামি রোল রয়েস গাড়ি এসে হাজির। বাংলাদেশের বিখ্যাত টায়ার -টিউব কোম্পানির দুজন বিদেশি সুন্দরীর মত খুবই সুন্দরী, মুখমন্ডল বাঙ্গালী নারীর মায়া ভরা চেহারা -চাহনীর মত মায়াবী । দুজন স্মার্ট গতিতে নামলেন ।  লিফট চড়ে সোজা আমীন সাহেবের চেম্বারে ঢুকে পড়লেন । এম ডি সাহেবের ডাইরেক্ট সুপারিশ ও আগ্রহে এসেছেন। এরা হচ্ছেন আনিকা তাবাসসুম গীতাঞ্জলী, ও মনিকা তাবাসসুম গীতিমাল্য। দুই বোন বিয়ে করেছে, একই পরিবারে আপন দুই খালাতো ভাইদেরকে । সৈয়দ আরিফ হাসান ও  সৈয়দ শরীফ হাসান । তাদের আদি বাড়ি মানিকগঞ্জের সাটুরিয়ায়। বনানীতে প্রসাদ সদৃশ্য বাড়ি।  টঙ্গীতে বিশাল এরিয়া, কারখানা কমপ্লেক্স। টাকা -পয়সার কোন কমতি নেই। শুধু একটা সমস্যা। আগের খালু, এখন শশুর। সৈয়দ আহসান আলী বিধিবদ্ধ নিয়মে,জীবন যাপন করতে ভালোবাসেন। দুই ছেলে, দুই বউয়ের  খরচ নিজ হাতে বরাদ্দ  করে থাকেন । কাপড় কেনা, খাওয়া-দাওয়া,কসমেটিক্স, ফার্নিচার,গাড়িতে চড়ে  বাইরে ঘোরাঘুরি করা, এমনকি বিদেশে যাওয়ার প্লেন ভাড়া, হোটেল ভাড়া সহ অন্যান্য খরচ সবকিছু যেন প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর  থেকে নিয়ন্ত্রিত। শুধুমাত্র হাত খরচ পায় না বলে, নিজের হাতে খরচ করতে পারে না বলে এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হওয়া। সৌখিন আবদার, খেয়াল খুশি মত খরচ করা । এরা দুজনের বউয়ের সঙ্গে (প্রাক্তন খালাতো ভাই) পরামর্শ ক্রমে বরাদ্দকৃত টাকা থেকে টাকা বাঁচিয়ে এই ব্যবস্থা করার জন্য এখানে এসেছেন। এমডি  সাহেবের এক ব্যাংকার বন্ধু এই পার্টিকে যোগাড় করে দিয়েছেন। প্রথমেই এফ ডি আর অথবা সঞ্চয়পত্র করার জন্য ব্যাংকার বন্ধুর কাছে গেলে, উনি পরামর্শ দিয়ে এখানে নিয়ে এসেছেন। তারা এখানে মূলধন খাটাবে। শুধুমাত্র নিজস্ব খরচের এই অবস্থা, তবু তার পরিমাণ বিশাল। মূলধন পাঁচ কোটির উপরে। মূল  টাকার পরিমাণ না জানি কত? পরে এমডি সাহেব, বিশেষ যত্নের জন্য নিজের চেম্বারে নিয়ে গেলেন। বিশেষ আপ্যায়ন করা হলো । এমডি,-”এমনি যৎ সামান্য আয়োজন, আপনাদের উপযুক্ত সম্মান দিতে  পারবো না”। আরিফ,-” আমাদেরকে নিয়ে  অত অরিড হতে হবে না “।  শরীফ, -”আমরা এত অভাবে পড়েনি”। আনিকা মজা করলো,-” সব কিছু বউদের”। মনিকা, -”ভাইদের নামে কিছুই হলো না “। এম ডি, -” অলরেডি আপনাদের নামে হয়ে গেছে। শুধু বাকি চেক জমার পর,  চেক অনার  হয়ে গেলে সবশেষ “। আরিফ,-” বউরা সবই পেল, ভাইয়েরা কিছুই পেল না “। আনিকা,-” ভাইয়েরা পরে কিছু পেলেও পেতে পারে,আফটার অল আবার তারা খালাতো ভাই “। আরিফ,-”এখন তাহলে উঠি”। আমিন,-”আপনাদের একটা করে অ্যাকাউন্ট করতে হবে “। শরিফ,-” তারপর”। আমিন,-” মাসে মাসে জমা হলে,আপনাদের মোবাইলে মেসেজ যাবে তারপর কনফার্ম”। শরীফ, -”কষ্ট দিলাম “। এমডি সাহেব,-” না- না- ছি- ছি-  ও কথা বলবেন না,আমরাই আপনাদেরকে কষ্ট দিলাম, মূল্যবান সময় নষ্ট করলাম”। আরিফ,-” তাহলে উঠি”। শরীফ ও আরিফ সাহেব দুজনেই এমডির সঙ্গে হাত মিলিয়ে বিদায় নিলেন ।

সারা পৃথিবীব্যাপী মহাদুর্যোগ নেমে এলো।  মহা দুর্যোগের নাম “করোনা “। করোনা আসলো। বাইরে যাওয়া সম্পূর্ণ নিষেধ। এমন ভয়াবহ পরিস্থিতি  আসলো যে, সারা দুনিয়ার বড় বড় শক্তিশালী রাষ্ট্রের মানুষেরা আক্রান্ত হয়ে প্রতিদিন এক মুহূর্তে পোকার মতো ঝাকে ঝাকে মৃত্যু হওয়া শুরু হলো। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মত বাংলাদেশের ভিতরে ভয়ংকর ও ভীতিকর রূপ ধারণ করলো । বাইরের বাতাসে মুখ বাড়ালেই সঙ্গে সঙ্গে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা যথেষ্ট বেশি হয়ে দাঁড়ায়। সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যুদুত এসে উপস্থিত হবে। বাঁচার জন্যই বাইরে না যাওয়ার তাগাদা,       ঘরমুখী হওয়া, জরুরী বাধ্যতামূলক। নেহাত জরুরী কাজ ছাড়া মানুষ বের হতো না। চাল ডালের বাজার, ওষুধ কেনা, মেডিকেল সার্ভিস ইত্যাদি এ ধরনের প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের হতো না। এরই মধ্যে আমিন সাহেবের মাস্ক পড়ে,অফিসে দূরত্ব বজায় রেখে, যেতে হয়, দপ্তর  চালাতে হচ্ছে। বাকি বাসায় ফাইল, কাগজপত্র নিয়ে গিয়ে প্রয়োজনীয় কাজ সারতে হচ্ছে। এ্যান্ড্রোয়েট ফোনে, ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে কোম্পানির এমডি সাহেব জরুরি কথা সারেন। এই পদ্ধতিতে অফিসের যাবতীয় নির্দেশনা দেন, আমিন সাহেবসহ অন্যান্য গ্রুপ লিডার পরিচালক গণকে । আমিন, -”স্যার আমিন”। এম ডি, -”বেশি বের হবেন না। সাবধানে বের হবেন,জীবন বাঁচানো ফরজ”। আমিন,-” কাজ চালিয়ে নিতে হবে “। এম ডি, -” কাজগুলো একবারে সারতে পারলে ভালো”। এমন সময় আমিন সাহেব ফোন পেলেন খয়রাত সাহেবের, -” আমিন সাহেব? কেমন আছেন, কিভাবে চলছে, চিন্তায় আছি “।  আমিন সাহেব  অভয় দিয়ে বললেন,-” আল্লাহ ভরসা। ইনশাল্লাহ সব ঠিক হয়ে  যাবে “। খয়রাত, -”আমি বিশেষ কিছু বলবো না, আপনার কাজ সারেন”। আমিন,-” করোনার টিকা নিয়েছেন কি “। খয়রাত, -”নিবো, বড় লাইন হয়,চান্স পাওয়া যায় না “। আমিন, -”আমিও দিবো, শুনছি নাকি সরকার ভূয়া ওষুধ এনেছে”। খয়রাত,-” নানা রকম ভুয়া খবর,গুজব  “। আমিন,-” আমি মানুষের কাছে শুনেছি”। খয়রাত,-” একদল  লোক আছে এই নিয়ে ব্যস্ত, তাদের কোন কাজ নেই, গুজব বা রটনা ছড়িয়ে বেড়ায়। আল্লাহ  দিয়েছে, বিপদে আল্লাহই উদ্ধার করবে”। আমিন, -” তবে সময় লাগবে “ খয়রাত, -”একটু ধৈর্য ধারণ করতে হবে “। 

নিত্য দিনের অর্থনীতি,বাণিজ্য,   বাজার ও প্রাত্যহিক লেনদেন না হওয়ার কারণে,কম হওয়ার কারণে, ক্রেতাশূন্য হতে হতে, ধীরে ধীরে বিরাট  অচলাবস্থার  মধ্যে পড়ে গেল। ছোট খাটো এ ধরনের ঘাটতি  থেকে বিশাল ঘাটতিতে পড়লো । মানুষে মানুষে মেলামেশা, আদান প্রদান, লেনদেন সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে রইলো। প্যারালাইস পঙ্গু হলো। জোয়ারের স্রোতে দআসতেছিল,   যে বৃহৎ টাকার পরিমাণ, সেই টাকা (মূলধন সহ) ভাটার টানে সব হারিয়ে গেলো । কোম্পানি বন্ধ হয়ে গেল,  কর্মকর্তারা পালিয়ে গেল, সুবিধা মতো জায়গায় লুকিয়ে  রইলো। ফোন করে পাওয়া যায় না। ফোন বন্ধ করে রাখা । বিশাল     মোহভঙ্গ হলো,বিশাল স্বপ্নভঙ্গ  হলো । মানুষ ভাবলো অবস্থা আরো ভালো হবে, কিন্তু অবস্থা উল্টো দিনে দিনে আরো খারাপ হলো। ক্ষুদ্র লগ্নিকারীরা অফিসে হামলা করলো।  অফিসের গ্ল্যাস ভাঙচুর করলো। ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ পথে বসে গেছে। উন্মাদ হয়ে গেছে। দলবদ্ধ হতে শুরু করলো । প্রেসক্লাবের  সামনে বিক্ষোভ হলো । হাত ধরে মানববন্ধন তৈরি করে বিক্ষোভ দেখালো । অনশন করা হলো। একবার উত্তেজিত মানুষদেরকে শান্ত করার জন্য, অফিসে ডেকে নিয়ে হিসাব সম্বলিত কাগজপত্র জমা নেওয়া হল। ভাবলো ঠিক হয়ে যাবে সব ।  কয়েক গ্রুপ মিলে থানায় ডায়েরি করা হলো মামলা হলো ।  যে একদম নিঃস্ব সেই চরম  বিপদে পড়ে গেল । কর্দমাক্ত গর্তে পড়ে হাবুডুবু খেলো । অনেকবার বলা হলো তদন্ত কমিটি গঠন করার জন্য । বার বার ধানাই- পানাই, গড়িমসি শুরু করল । প্রশাসনের সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। 

ক্ষতিগ্রস্থদের সংখ্যার পরিমাণ বাড়তে লাগলো। ভুক্তভোগীদের মধ্য থেকে তিন- তিনটা গ্রুপ থেকে বেছে  নিজেরাই গোপনে একটা কমিটি  করলো ;তিন মাস পর রিপোর্ট দিতে হবে। প্রশাসনকে বুঝতে দিলো না। গোপনে ও গোয়েন্দা ভাবে উচ্চতর তদন্ত ু,ইনকোয়ারি বা অনুসন্ধানী তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হলো। এদের মধ্যে প্রধান করা হলো, সবচেয়ে,অভিজ্ঞ খন্দকার ফারুক হোসেনকে। পরে নিয়োগ দেওয়া হলো।  আর্মিতে, গোয়েন্দা বিভাগে কাজ করার মত অল্প কিছু  অভিজ্ঞতা। বাকি দুজনকে গ্রুপের  বহিরাগত সদস্য থেকে পছন্দ মত নেওয়া হল।  ফারুক সাহেব কে সবাই চিনে। অপর দুজন রহিম ও ফজল সাহেবকে বলতে গেলে কেউ তেমন চিনে না । সন্দেহজনক ( মুখোশে আড়ালকারী মানুষ) । রহিম সাহেবকে তো চলে। কিন্তু ফজল সাহেব কে বুঝা গেল না । চাঁদা তুলে  তাদের কর্মকান্ডে সাহায্য করার যথেষ্ট আশ্বাস দেওয়া হলো। এদের কৌশল জানা আছে, ফারুক সাহেবের পূর্ব পরিচিত, জানাশোনা । স্কুল ছুটির পর, সন্ধ্যার পর ক্লাস রুমে বসা হলো । নির্ধারিত উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে গোপনে বৈঠক হলো । বিশেষ করে গোপনে

পরিচালকবৃন্দের বিদ্রোহী গ্রুপ (এমডির অনুগত কিছু লোক ছাড়া) । আরো দুজন রহিম ও ফজল সাহেবকে  নিয়ে রহস্য লুকিয়ে আছে। রহস্যাবৃত মানুষ। প্রথমে বেশ আপত্তি ছিল, গুঞ্জন উঠেছিল,  পরে ফারুক সাহেবের মৃদু ধমকে থেমে গেল । প্রথমে ফারুক সাহেব, তার তদন্তের জন্য বেশ টাকা- পয়সার  দরকার,  তা বিদ্রোহী গ্রুপের তরফ থেকে নিশ্চিত করে  নিলেন । তিন মাসের সময় নিলেন।

পরে তিন মাস যাওয়ার পর কোন কিছুই হলো না। উনাদের অনুরোধে আরো তিন মাস বাড়ানো হলো। এরপরেও আরো ছয় মাস বাড়ানো হলো। এক বছর পর এ কমিটি কোন কিছুতেই কিছুই করতে পারলো না। তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ তো দুরের কথা,। কোন প্রকার ক্লুয়ের সন্ধান করতে পারলো না। কয়েক বছর পর উল্টো যে রহস্য বের হলো,রহিম সাহেব হচ্ছেন সরকারি তরফের লোক, ছদ্নাবেশে গোপনে রিপোর্ট সরবরাহ করার জন্য সরকারিভাবে নিয়োজিত।  এই অবস্থার এই রূপ ধারণ করে এখানে এসেছেন। আর ফজল সাহেব খোদ  মালিকপক্ষের লোক। আরেক ছদ্মাবেশ ধারণ করে মালিকের  পক্ষ থেকে কথা ও তথ্য সংগ্রহের জন্য গোপনে এখানে এসেছেন। এদিকে মানুষের  প্রতিবাদ মিছিল, মানব বন্ধন, ঝাড়ুর মিছিল, অনশন করা,গালিগালাজ করা ইত্যাদির সংখ্যা কমে গেলো ক্রমশ । সাধারণ জনগণের শেষ নাগরিক অধিকার আদায়ের জন্য আদালতের দারস্থ হল। কেইসের তারিখ একটার পর একটা পড়ে যেতে লাগলো । কিছু হলো না। সুষ্টু বিচারের স্বার্থে, দীর্ঘসুত্রিতার  কারণে মানুষের  আরো হতাশা বাড়লো ।  এখন শুধু উপরওয়ালাই  এক মাত্র ভরসা । 

লেখক -মুজিবুস সামাদ

Post a Comment

0 Comments