গ্রেনেড হামলার সেই ভয়াল ২১শে আগস্ট ।
-মনির ।
২০০৪ সালের এই দিনে বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাস বিরোধী সমাবেশে স্মরণকালের নৃশংসতম গ্রেনেড হামলা হয়েছিল । বছরের চাকা ঘুরে ফিরে এলে সেই ভয়াল ২১শে আগস্ট । গা শিহরে উঠা সেই ভয়াল রক্তঝরা দিন । আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করার ঘৃণ্য লক্ষ্যে পরিকল্পিতভাবে সংঘবদ্ধ গ্রেনেড হামলা চালায় ঘাতকের দল । সেদিন স্পষ্টতই তাদের হামলার প্রধান লক্ষ্যবস্তু ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের অসাম্প্রদায়িক শক্তির প্রধান নেত্রী, বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা । ভাগ্যক্রমে ঘাতকের গ্রেনেড বিস্ফোরণ ও গুলিবর্ষণ থেকে শেখ হাসিনা বেঁচে গেলেও নিহত হন আইভি রহমানসহ ২৪ জন নেতাকর্মী । ইতিহাসের বর্বরতম সেই ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার তৃতীয় বর্ষ পার হল । অথচ তৎতকালিন ক্ষমতায় থাকা বিএনগি সরকার সেই হামলাকারী খুনিদের বিচার হওয়া তো দূরের কথা, প্রকৃত খুনিদের কাউকে গ্রেপ্তারও করেনি । তৎকালীন ক্ষমতাসীন মহলের রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের হীন চেষ্টা, হামলাকারীদের আড়াল করার লক্ষ্যে তদন্তের নামে নানারকম টালবাহানা এই ঘটনার ওই সময়ে সুবিচার পাওয়ার আশাকে করেছে সুদূর পরাহত । ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় নিয়ে আসতে সে সময়কার বিএনপি-জামাত জোট সরকারের ব্যর্থতা এবং অনীহা সন্ত্রাসীচক্রকে করে তোলে আরো হিংস্র, আরো বেপরোয়া । তারা অব্যাহতভাবে ঘটিয়ে চলে আরো হামলা ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ।

পেছানো তাকানে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট । :
২১ আগস্ট, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট । সেদিন ছিল শনিবার। বিকেলে বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে শুরু হয় আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশ । প্রধান অতিথি ছিলেন আওয়ামী লীগের সভানত্রী ও তৎকালীন সংসদে বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা । সমাবেশ শেষে সন্ত্রাসবিরোধী মিছিল হওয়ার কথা । তাই মঞ্চ নির্মাণ না করে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে একটি ট্রাককে মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করা হয় । সমাবেশে অন্য নেতাদের বক্তৃতার পর বক্তৃতা করেন শেখ হাসিনা । শেখ হাসিনার বক্তৃতা মাত্র শেষ হয়েছে সময় ৫ টা ২২ মিনিট । হঠাৎ বিকট শব্দে গ্রেনেডের বিস্ফোরণ । তারপর খই ফোটার মতো একের পর এক বিস্ফোরণ ঘটতেই থাকে । জনাকীর্ণ সমাবেশে মঞ্চ হিসেবে ব্যবহৃত ট্রাককে লক্ষ্য করে ছোড়া হলো গ্রেনেডগুলো । কিছু বুঝে ওঠার আগেই বিস্ফোরিত হলো ১৩টি গ্রেনেড । নিশ্চিতই হামলাকারীদের লক্ষ্য ছিলেন শেখ হাসিনা । পরিস্থিতির তাৎপর্য বুঝতে পেরে ট্রাকে অবস্থানরত নেতৃবৃন্দ ও শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত দেহরক্ষীরা ঘিরে ফেলেন তাকে । প্রিয় নেত্রীকে রক্ষা করতে মানবঢাল রচনা করেন তারা । হামলাকারীরা যখন বুঝতে পারলো গ্রেনেড জখম করতে পারেনি শেখ হাসিনাকে, গুলি ছুড়তে শুরু করলো তারা । নেতৃবৃন্দ ও দেহরক্ষীরা দ্রুত শেখ হাসিনাকে তার বুলেটপ্রুফ গাড়িতে তুলে দেন । এ সময় শেখ হাসিনাকে লক্ষ্য করে ছোড়া হয় পর পর ৬টি বুলেট । ভাগ্যক্রমে বুলেট থেকেও রক্ষা পান শেখ হাসিনা । তবে বুলেটবিদ্ধ হন শেখ হাসিনাকে পেছন থেকে আগলে রাখা তার ব্যক্তিগত দেহরক্ষী মাহবুব । গাড়িতেও একাধিক বুলেট আঘাত হানে । গ্রেনেড বা বুলেটের আঘাতে শেখ হাসিনা আহত না হলেও গ্রেনেডের বিকট শব্দে তার কানের শ্রবণযন্ত্র মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা এখনো সারেনি । সেদিন যারা নিহত হন সেদিন শেখ হাসিনা প্রাণে রক্ষা পেলেও হতাহত হন আওয়ামী লীগের অসংখ্য নেতাকর্মী । গ্রেনেড ও গুলির আঘাতে ঘটানস্থলে এবং পরে হাসপাতালে প্রাণ হারান মোট ২৪ জন । এরা হচ্ছেন : আইভি রহমান, মোস্তফা আহমেদ সেন্টু, মাহবুবুর রশীদ, সুফিয়া বেগম, রফিকুল ইসলাম,আব্বাস উদ্দিন শিকদার রতন, লিটন মুন্সি, আব্দুল কুদ্দুস পাটোয়ারী, বেলাল হোসেন, রেজিয়া বেগম, আবুল কালাম আজাদ, হাসিনা মমতাজ রীনা, আতিক সরকার, আবুল কাশেম, আমিনুল ইসলাম, জাহেদ আলী,মুমিন আলী, নাসির উদ্দিন সরদার, মামুন মৃধা, ইসহাক মিয়া, শামসুদ্দিন এবং অজ্ঞাতনামা আরো দুজন । ২৪ জন নিহত হওয়া ছাড়াও সেদিন আহত হয়েছিলেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দসহ ৪ শতাধিক নেতাকর্মী ।
২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের সমাবেশে পরিকল্পিত হামলায় ১৩টি গ্রেনেড বিস্ফোরণ ঘটে এবং সমাবেশস্থলে ও এর আশপাশে বেশ কয়েকটি গ্রেনেড অবিস্ফোরিত অবস্থায় পাওয়া যায় । ধারণা করা হয়, অন্তত ২০ জনের একটি সুপ্রশিক্ষিত দল সমাবেশস্থলের ৩ দিক থেকে জনতার সঙ্গে মিশে গিয়ে এবং বিপরীত দিকের ভবন থেকে একের পর এক গ্রেনেড ছুড়ে মারে । পরে হামলাকারীদের একটি গ্রুপ মঞ্চ হিসেবে ব্যবহৃত ট্রাকের খুব কাছ থেকে শেখ হাসিনাকে লক্ষ্য করে গুলি করে । হামলার বীভৎসতায় মুহূর্তেই রক্তমাংসের স্তূপে পরিণত হয় বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের সমাবেশস্থল । সেদিন সমাবেশস্থল ও এর আশপাশে কয়েক শ’ সশস্ত্র পুলিশ এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা কর্তব্যরত থাকলেও রহস্যজনকভাবে সবার চোখকে ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয় হামলাকারীরা । পুলিশ কাউকে আটক তো করতে পারেইনি বরং হতাহতদের উদ্ধারে এগিয়ে আসা নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের ওপর ব্যাপকভাবে লাঠিচার্জ এবং টিয়ারগ্যাস নিক্ষেপ করে হামলাকারীদের পালিয়ে যেতে সহযোগিতা করে । ২০০৪ সালের সেই নারকীয় গ্রেনেড হামলা ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা এ দেশের মানুষকে সাময়িকভাবে শোকস্তব্ধ করে দিলেও শিগগির শক্তিতে পরিণত হয় সে শোক । জনজীবনে নানাবিধ সমস্যা ও সংকট নিরসন এবং অন্যান্য রাজনৈতিক দাবির পাশাপাশি গ্রেনেড হামলাকারী খুনিদের গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবিতে দানা বাঁধে আন্দোলন । দিনে দিনে আরো শক্তিশালী হয়ে ওঠে রাজপথের আন্দোলন । সে আন্দোলনের তোড়ে টালমাটাল হয়ে ওঠে তৎকালীন সরকার । বছর ঘুরে আবারো এসেছে সেই ভয়াল ২১ আগস্ট ।

0 Comments