মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের বিষয়ে সরকারকে অবস্থান স্পষ্ট করতেই হবে
১৬ মাসে মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর আঘাত এসেছে নানাভাবে:
ফজরের নামাজ আদায়ের জন্য মসজিদে যাচ্ছেন মুসল্লিরা। যাওয়ার পথেই দেখতে পান বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কবরের জন্য নির্ধারিত সীমানা বেড়ায় আগুন জ্বলছে। পরে মসজিদের মাইকে ঘোষণা দেওয়া হলে স্থানীয়রা ছুটে এসে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, ঘটনাস্থলে পেট্রল গত রবিবার ভোররাতে রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার বাহাদুরপুর ইউনিয়নের তারাপুরে তারাপুর কবরস্থানে এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় এলাকাবাসীসহ মুক্তিযোদ্ধারা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। শুধু এ ঘটনাই নয়, ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে গত ১৬ মাসে মহান মুক্তিযুদ্ধের ওপর নানাভাবে আক্রমণের খবর গণমাধ্যমে হয়েছেন বীর মুক্তিযোদ্ধারা। ধ্বংস করা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য ও স্মৃতিচিহ্ন।ও কেরোসিনের গন্ধ পরিকল্পিত অগ্নিসংযোগের ইঙ্গিত দেয়।মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের বিষয়ে সরকারকে অবস্থান স্পষ্ট করতেই হবে
ফজরের নামাজ আদায়ের জন্য মসজিদে যাচ্ছেন মুসল্লিরা। যাওয়ার পথেই দেখতে পান বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কবরের জন্য নির্ধারিত সীমানা বেড়ায় আগুন জ্বলছে। পরে মসজিদের মাইকে ঘোষণা দেওয়া হলে স্থানীয়রা ছুটে এসে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, ঘটনাস্থলে পেট্রল ও কেরোসিনের গন্ধ পরিকল্পিত অগ্নিসংযোগের ইঙ্গিত দেয়।
গত ০১/১২/২৫ রবিবার ভোররাতে রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার বাহাদুরপুর ইউনিয়নের তারাপুরে তারাপুর কবরস্থানে এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় এলাকাবাসীসহ মুক্তিযোদ্ধারা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। শুধু এ ঘটনাই নয়, ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে গত ১৬ মাসে মহান মুক্তিযুদ্ধের ওপর নানাভাবে আক্রমণের খবর গণমাধ্যমে হয়েছেন বীর মুক্তিযোদ্ধারা। ধ্বংস করা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য ও স্মৃতিচিহ্ন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে সরকারের দুর্বল ও অস্পস্ট অবস্থানই বারবার এসব ঘটনা ঘটাতে উৎসাহিত করছে স্বাধীনতাবিরোধীদের। তাঁরা বলছেন, মহান মুক্তিযুদ্ধ ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের বিষয়ে সরকারকে তার অবস্থান স্পষ্ট করতেই হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এগুলো খুবই অপ্রত্যাশিত, অত্যন্ত হতাশাব্যঞ্জক। বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাই হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের ওপরে।সেখানে মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর আক্রমণ, তাঁদের কবরের ওপর আক্রমণ বা জীবিত অবস্থায় আক্রমণ—এগুলো তো অপ্রত্যাশিত নয় কেবল, অকল্পনীয়ও। এগুলো ঘটার মানে হচ্ছে, একটি প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি এখানে সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠছে।’
গত গত ০১/১২/২৫ রবিবার সকালে রংপুরের তারাগঞ্জে নিজ বাড়িতে বীর মুক্তিযোদ্ধা যোগেশ চন্দ্র রায় ও তাঁর স্ত্রী সুবর্ণা রায়ের রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় এই দম্পতির ছেলে শোভন চন্দ্র রায় বাদী হয়ে থানায় মামলা করেছেন। শোভনের দাবি, বছরখানেক আগে গ্রামের শ্মশানকে আট শতক জমি দান করাটাই কাল হয়েছে বাবা-মার।
এ ঘটনা কিছু লোক মেনে নিতে পারেনি। তবে পুলিশ এখনো এ হত্যার কারণ সম্পর্কে কিছু জানায়নি। এ বিষয়ে উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার আলী হোসেন বলেন, বিজয়ের মাসে এভাবে বীর মুক্তিযোদ্ধাকে জীবন দিতে হবে—এটা মানতে পারি না। আমরা মুক্তিযোদ্ধারা নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত।
মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কথা বললেই গত ১৬ মাসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হেনস্তা, ব্যক্তিগত আক্রমণ ও ফ্যাসিস্টের দোসর আখ্যা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশব্যাপী বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের ম্যুরাল ও ভাস্কর্য—ধ্বংস করা হয়েছে। এই সংখ্যা দেড় হাজারের মতো বলে কয়েকটি গণমাধ্যম সংবাদও প্রকাশ করেছে। হামলা ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে জাদুঘরেও। এসব ঘটনায় দেশের মানুষ সংক্ষুব্ধ।
গত রবিবারই প্রথম নয়, মুক্তিযোদ্ধাদের কবরের আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে আগেও। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সাবেক কার্যকর সভাপতি ও সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা মইন উদ্দীন খান বাদলের কবরে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে গত বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর। আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মতিয়া চৌধুরীর মৃত্যুর পরের দিন গত বছরের ১৭ অক্টোবর মিরপুরের বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে স্বামী বজলুর রহমানের কবরে শায়িত হন তিনি। নিয়ম থাকলেও স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাঁকে ‘গার্ড অব অনার’ দেওয়া হয়নি।
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে গত বছরের ১০ নভেম্বর পিটুনির শিকার হন বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রহমান। পরে সিরাজগঞ্জের একটি হত্যা মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। গত বছর বিজয়ের মাস ডিসেম্বরেই (২২ ডিসেম্বর) কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল হাই কানুকে গলায় জুতার মালা পরিয়ে লাঞ্ছিত করা হয়। নিরাপত্তাহীনতায় এক পর্যায়ে বাড়ি ছাড়তেও বাধ্য হন এ মুক্তিযোদ্ধা। এতেও লাঞ্ছনা শেষ হয়নি মুক্তিযোদ্ধা কানুর। গত এপ্রিলে তাঁর বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুর চালায় দুর্বৃত্তরা। গত বছরের ৫ আগস্ট মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িত ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত ধানমণ্ডি ৩২ নম্বর বাড়িটি পুড়িয়ে দেওয়া হয়। গত ফেব্রুয়ারিতে দ্বিতীয় দফায় হামলা করা হয় বাড়িটিতে।
গত ১৭ নভেম্বর জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রায় ঘোষণার দিন এক্সকাভেটর বা খননযন্ত্র নিয়ে বাড়িটি আবারও ভাঙতে যায় কিছু বিক্ষোভকারী। এ যাত্রায় অবশ্য সেনাবাহিনী ও পুলিশের বাধার মুখে পড়ে বিক্ষোভকারীরা। পরে সরিয়ে নেওয়া হয় খননযন্ত্র। গত বছরের ৫ আগস্ট রাজধানীর বিজর সরণিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য ভাঙা হলেও বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে একাত্তরের স্বাধীনতাযুদ্ধ পর্যন্ত বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের ম্যুরালসংবলিত সাতটি দেয়াল কিছুটা অক্ষত ছিল। গত জুনে তাও ভেঙে ফেলে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)।
গত ২৮ আগস্ট রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে মঞ্চ ৭১ আয়োজিত ‘আমাদের মহান স্বাধীনতাযুদ্ধ এবং বাংলাদেশের সংবিধান’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় ‘মব’ সৃষ্টি করে বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাংবাদিক ও শিক্ষকদের হেনস্তা ও আটকের ব্যাপক সমালোচনা ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল। এদিন দিবাগত রাতেই মবের শিকার হওয়া বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল লতিফ সিদ্দিকী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন, সাংবাদিক মঞ্জুরুল আলমসহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে শাহবাগ থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) বাদী হয়ে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা করেন। এবার বিজয়ের মাসের প্রথম দিন চট্টগ্রামের সন্দ্বীপে এক অনুষ্ঠানে সমবেত কণ্ঠে ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ স্লোগান দিতে শোনা যায়। বিজয়ের মাসে অনুষ্ঠিত বিসিএস লিখিত পরীক্ষার প্রশ্নপত্রেও মুক্তিযুদ্ধকে বিতর্কিত করার অভিযোগ উঠেছে। গত ৩ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত পরীক্ষায় ‘বাংলাদেশ বিষয়াবলি’ বিষয়ের ‘মহানন্দা’ সেটের প্রশ্নে মুক্তিযুদ্ধকে বলা হয় ‘প্রতিরোধ যুদ্ধ’ এবং পাকিস্তানি বাহিনীর পরিবর্তে লেখা হয় শুধু ‘দখলদার বাহিনী’।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধকে এমনভাবে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করেছে, মুক্তিযুদ্ধের মহিমা ক্ষুণ্ন হয়েছে। ফলে আগে মুক্তিযুদ্ধের কথায় মানুষের মধ্যে যে উৎসাহ-উদ্দীপনা ও শ্রদ্ধার সৃষ্টি হতো, তা অনেকটাই নষ্ট হয়েছে। কিন্তু তার পরও এসব ঘটনা ঘটবে, কখনো ভাবিনি। তা খুবই দুঃখজনক ও কলঙ্কজনক। এ পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট ও শক্ত হওয়া উচিত বলে আমি মনে করি। সরকার এসব বিষয়ে স্পষ্ট বক্তব্য ও শক্ত পদক্ষেপ নিলে এরা নিরুৎসাহী হতো নিশ্চয়ই।’ মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের হেনস্তা ও বিভিন্নভাবে হেয় করা ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন নয় বলে মত দেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী।
অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘তারা মনে করছে, তাদের হাতে এখন ক্ষমতা আছে। সুতরাং তারা যা খুশি তাই করতে পারে। এ ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকারেরও দায়িত্ব আছে। তাদের অবস্থান আরো স্পষ্ট হওয়া দরকার মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে। এই মুক্তিযুদ্ধবিরোধীদের অনেকেই হয়তো লুকিয়ে বা ছদ্মবেশে ছিল। তারা এখন সক্রিয় হয়ে উঠেছে, চেষ্টা করছে মুক্তিযুদ্ধকে ছোট করার। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, মব সন্ত্রাসকে সরকারের লোকজন কিংবা প্রশাসন সমর্থন দিচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের গুরুত্ব খর্ব করা বা এর বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের তৎপরতা চালানোসহ এসব বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব হচ্ছে এগুলোকে থামানো। এর বিরুদ্ধে সরকারকে পরিষ্কার অবস্থান নিতে হবে। সরকারের ভূমিকার কারণে তারা এসব করার সাহস পাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করতেই হবে। এটা তো মানবাধিকারেরও প্রশ্ন।’ সুত্রে - সমকাল, ০৯ ডিসেম্বর, ২০২৫

0 Comments